আশুরা আরবি শব্দ, অর্থ মুহররম মাসের দশ তারিখ এটি পালন করা হয়। কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার আগে এ দিনটি আনন্দোৎসবের মধ্য দিয়ে পালিত হতো। এর কারণ এদিন হযরত মূসা (আঃ) ও তাঁর জাতি ফেরাউনদের অত্যাচার থেকে মুক্তিলাভ করে। আরও একটি কারণ হিসেবে কথিত হয় যে, হযরত নূহ্-র (আঃ) যুগে এক ভয়ঙ্কর প্লাবনে সবকিছু ডুবে গেলে তিনি মোমিনদের নিয়ে নৌকায় ওঠেন এবং প্লাবনশেষে এ আশুরার দিনেই স্থলভাগে অবতরণ করেন।
এ দিনটিকে শিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা সর্বজনীন শোকদিবস এবং সমগ্র মুহররম মাসকে চরম আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে মনে করে। বাংলাদেশে প্রধানত শিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা আশুরা উদযাপন করে। ঢাকার আহসান মঞ্জিল এর প্রধান কেন্দ্র। এখান থেকে তাজিয়া সহকারে শোভাযাত্রা বের করা হয় এবং শোভাযাত্রার সময় ‘হায় হোসেন! হায় হোসেন!’ ধ্বনি উচ্চারণ ও বুক চাপড়িয়ে শোক প্রকাশ করা হয়। গ্রামাঞ্চলে এ উপলক্ষে জারি গান ও নাচের আসর বসে। মেয়েরা গভীর রাত পর্যন্ত মাতম বা শোকগীতি গায়।
শিয়ামতবাদের উদ্ভব ইরাকে ও ইরানে হলেও সেখানে এরূপ শোকমিছিলে তাজিয়া বহন করা হয় না। ভারতীয় উপমহাদেশে কখন থেকে তাজিয়া মিছিলের প্রবর্তন হয়, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। বাংলাদেশে মুগল আমলে বিশেষত শাহ সুজা (১৬৩৯-১৬৫৯) বাংলার সুবেদার থাকাকালে শিয়াদের প্রভাব বৃদ্ধি পায়। সম্ভবত তখনই এখানে তাজিয়া মিছিলের প্রচলন হয়। বাদশা আকবরের আমলে আগ্রা দুর্গ থেকে তাজিয়া বের হতো যা মুগল তাজিয়া নামে অবহিত হয়েছে। শাহ সুজার সময়ে সৈয়দ মীর মুরাদ ১০৫২ হিজরি সনে (১৬৪২ খ্রি.) ঢাকার ঐতিহাসিক হোসেনী দালান নির্মাণ করেন। ঢাকার নায়েব-নাজিমদের অধিকাংশ ছিলেন শিয়া। তাঁদের দ্বারা দেশের বিভিন্ন স্থানে ইমামবারা নির্মিত হয়। ঢাকা, মানিকগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, অষ্টগ্রাম, সৈয়দপুর, সিলেট ইত্যাদি স্থানে ইমামবারা আছে। তাজিয়া মিছিলের কয়েকটি লক্ষণীয় দিক হলো: ১. হযরত হুসায়ন (রা.)-এর সমাধির প্রতিকৃতি বহন করা; এটি কাঠ, কাগজ, সোনা, রূপা, মারবেল পাথর ইত্যাদি দিয়ে তৈরি করা হয়; ঢাকার হুসেনী দালানের তাজিয়াটি কাঠ ও রূপার আবরণ দিয়ে তৈরি, যা নবাব সলিমুল্লাহ দান করেন। তাজিয়া মিছিলে মাতম করা, বুক চাপড়ানো ও জিঞ্জির দিয়ে পিঠের ওপর আঘাত করে রক্তাক্ত করা হয়। তাজিয়া মিছিলের অগ্রভাগে আলম বহনকারী বাহিনীর পেছনে থাকে বাদ্যকর; তৎপশ্চাতে কয়েকজন লোক লাঠি ঘোরাতে ঘোরাতে ও তরবারি চালাতে চালাতে অগ্রসর হয়। এ সময় দুটি শিবিকাসহ অশ্বারোহী সৈন্যের সাজে কয়েকজন লোক শোক প্রকাশ করতে করতে অগ্রসর হয় এবং তার পেছনে একদল গায়ক শোকগান গাইতে থাকে; পরে থাকে হুসায়ন (রা.)-এর সমাধির প্রতিকৃতি। এভাবে মিছিলটি নিয়ে লোকজন সম্মুখে অগ্রসর হয় এবং একটি পূর্ব নির্ধারিত স্থানে গিয়ে তা শেষ হয়।
-পার্বত্য সময়

