কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে পাহাড়ের ৫৪ হাজার একর জমি তলিয়ে যায় হ্রদের পানিতে। শুরু হতে থাকে পাহাড়ে ক্ষোভ। তৎকালীন প্রেক্ষাপটে পাহাড়ি মানুষের অধিকারের দাবিতে সোচ্চার হলেন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (এম এন লারমা)। স্কুলশিক্ষক চিত্তকিশোর চাকমার তৃতীয় সন্তান এম এন লারমা কেবল চট্টগ্রাম কলেজ থেকে স্নাতক পাস করেছেন। পাহাড়ে একদিকে যেমন ক্ষোভ বাড়ছিল, অন্যদিকে বাড়তে থাকে এম এন লারমার জনপ্রিয়তা।
'পাহাড়ি ছাত্র সমিতি' নামে একটি সংগঠনের নেতৃত্বেই নানা কর্মসূচি, প্রতিবাদ ও আন্দোলন চলে। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেয় পাহাড়ের প্রথম রাজনৈতিক দল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)। আজ বুধবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) জেএসএসের ৫১ বছর পূর্তি।
পাহাড়িদের আন্দোলনের ইতিহাস একেবারেই নতুন নয়। ব্রিটিশ শাসনামলেই ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে পাহাড়িদের শিক্ষিত যুবসমাজ সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা চালাতে থাকে। ১৯১৫ সালে রাজমোহন দেওয়ানের নেতৃত্বে চাকমা যুবক সমিতি গঠন করা হয়। কামিনী মোহন দেওয়ানের নেতৃত্বে ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসমিতি। এটি ছিল মূলত সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন। ১৯২৮ সালে চাকমা যুবক সংঘ নামে ঘনশ্যাম দেওয়ানের নেতৃত্বে আরেকটি সংগঠন জন্ম নেয়। যেটি পাহাড়িদের জাতীয় চেতনা উন্মেষের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৩৯ সালে যামিনীরঞ্জন দেওয়ান ও স্নেহ কুমার চাকমার নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসমিতি পুনরুজ্জীবিত হয়।
মণিপুর, আরাকানসহ চট্টগ্রামের এ পার্বত্য অঞ্চল বরাবরই অশান্ত ছিল। পাহাড়ি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে কোলহ, মারামারি লেগে থাকা এবং যাতায়াত ব্যবস্থার দূরুহতার কারণে এ অঞ্চল শাসন করা বৃটিশদের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। উপায়ান্তর না পেয়ে ১৯০০ সালের শাসনবিধির মাধ্যমে এ অঞ্চলকে বিশেষ প্রাদেশিক অঞ্চল বলে ঘোষণা করে ব্রিটিশ সরকার। পাকিস্তান সরকার ১৯৫৮ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম (ভূমি অধিগ্রহণ) প্রবিধান নামে আইন জারি করে। এরপর ১৯৬০ সালের দিকে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে পাহাড়ি ছাত্র সমিতি ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে। ১৯৬২ সালের ১৩ নভেম্বর চট্টগ্রাম বান্ডেল রোডে পাহাড়ি ছাত্রাবাসে ছাত্রদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে এম এন লারমা জুম্ম (পাহাড়ি) ছাত্রসমাজকে গ্রামাঞ্চলে গিয়ে পাহাড়ি সমাজের শিক্ষাবিস্তারসহ জাতীয় জাগরণ ঘটানোর আহ্বান জানান।
এম এন লারমাসহ জেএসএসের প্রতিষ্ঠাকালীন বেশির ভাগ সদস্য বামপন্থী ছিলেন। বাংলাদেশের মূলধারার বামপন্থী অনেক দলের সঙ্গে তাদের সুসম্পর্ক ছিল এবং এখনো আছে। ১৯৬৬ সালে মানবেদ্র লারমার ভাই সন্তু লারমা ও কিছু তরুণের নেতৃত্বে গঠিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম উপজাতীয় কল্যাণ সমিতি। সেই সময় রাজনৈতিক দল গঠন করা কঠিন ছিল। তাই কল্যাণ সমিতি গঠন করে মূলত রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানো হয়। ওই সময়েই স্কুলশিক্ষক সন্তু লারমার নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শিক্ষক সমিতি।’ পেশাজীবীদের এই সংগঠন পাহাড়ের নানা শ্রেণির মানুষকে রাজনৈতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে।
তবে এ সময় পাহাড়ি কিছু গোষ্ঠীর কাছে থেকে বাধা পেয়েছে। পাহাড়ি যুব সংঘ, ট্রাইবাল পিপলস পার্টি (টিপিপি), পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি ও তার সহযোগী সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম গণমুক্তি পরিষদ, মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট (এমএনএফ), বামাঞাতা গ্রুপ, রাকাপা—এসব গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বিরোধিতার মুখে পড়ে দলটি।
সক্রিয় রাজনৈতিক দল না হলেও ১৯৭০ সালের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম উপজাতি কল্যাণ পরিষদের’ ব্যানারে বিপুল ভোটে জয়ী হন এম এন লারমা। রাজনৈতিক দল হিসেবে পাবর্ত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯৭২ সালে। ওই বছর মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের খসড়া সংবিধানপ্রণেতাদের কাছে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্তশাসনের দাবিসহ মোট চার দফা দাবি পেশ করেন। দাবিগুলো ছিল—(ক) পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্তশাসন এবং নিজস্ব আইন পরিষদ গঠন (খ) সংবিধানে ১৯০০ সালের রেগুলেশনের অনুরূপ সংবিধির অন্তর্ভুক্তি (গ) উপজাতীয় রাজাদের দপ্তর সংরক্ষণ (ঘ) ১৯০০ সালের রেগুলেশন সংশোধনের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক বিধিনিষেধ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের বসতি স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ। কিন্তু দাবিগুলো সংবিধান ও গণতন্ত্রবিরোধী হওয়ার কারণে সে সময় দাবিগুলো প্রত্যাখ্যান করা হয়।
১৯৭৫ সালে জেএসএস সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করে। গঠন করে সশস্ত্র শাখা ‘শান্তি বাহিনী’। এরপর ক্রমে পার্বত্য এলাকায় সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। তখন অনেক পাহাড়ি মানুষ দেশত্যাগ করে। যদিও বিভিন্ন মাধ্যমের দাবি ১৯৭২ বা ৭৩ থেকে পিসিজেএসএস-এর সশস্ত্র শাখা ছিল। তারা প্রথম রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর আক্রমণ শুরু করে ক্ষিরাম বন বিভাগের ওপর হামলার মধ্য দিয়ে। এ হামলার মধ্য দিয়ে তারা তাদের উপস্থিতি এবং শক্তির সক্ষমতা জানান দেয়। এবং ১৯৭৭ সালে বান্দরবান সাঙ্গু নদে পাঁচ সেনাসদস্যকে গুলি করে হত্যার মধ্য দিয়ে তারা তাদের শক্তি ও হিংস্রতা প্রকাশ করে। চাঁদাবাজি ও নানারকম উৎস্য হতে আসা টাকার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে নিজেদের ভেতরেই সৃষ্টি হয় কোলহ। এ কারণেই তাদের এই সশস্ত্র লড়াই চলার সময় ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর আটজন সহযোদ্ধাসহ এম এন লারমাকে হত্যা করে নিজ দলেরই একটি অংশ।
১৯৮৫ সালের ২১ অক্টোবর এরশাদ সরকারের সঙ্গে প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক শুরু হয় জেএসএসের। ওই বৈঠকে জেএসএসের প্রতিনিধিদল পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে রাজনৈতিক ও জাতীয় সমস্যা হিসেবে তুলে ধরে। তবে এরশাদ সরকারের সঙ্গে ছয় দফা বৈঠক হলেও সমস্যার সমাধান হয়নি। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার এসেও জেএসএসের সঙ্গে আলোচনা করে। সে সময়ের যোগাযোগমন্ত্রী অলি আহমদের নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটির সঙ্গে মোট ১৩ বার বৈঠক হলেও শেষ পর্যন্ত কোনো সুরাহা হয়নি।
১৯৯৬ সালের ১৪ অক্টোবর শেখ হাসিনা সরকার জাতীয় সংসদের তৎকালীন চিফ হুইপ আবুল হাসানাত আবদুল্লাহকে আহ্বায়ক করে ১১ সদস্য বিশিষ্ট পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক জাতীয় কমিটি গঠন করে। এ কমিটির সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এরপর অস্ত্র সমর্পণ করে জেএসএসের সামরিক শাখা শান্তি বাহিনী। শেষ হয় দুই দশকের রক্তক্ষয়ী সংঘাত।
তবে চুক্তি বাস্তবায়ন হয়নি বলে পাহাড়ে এখনও তাদের সশস্ত্র কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ আছে। চুক্তির পরবর্তী সময়ও জেএসএস তাদের সশস্ত্র শাখার তৎপরতা বন্ধ করেনি এবং সশস্ত্র সদস্যদের অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণ করেনি। জেএসএস চুক্তির মধ্য দিয়ে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে চুক্তির ৭২টি ধারার ৯৯টি উপধারার সুযোগ সুবিধা হাতিয়ে নিয়েছে। চুক্তির ৯৯টি উপধারার মধ্যে সরকার প্রায় ৬৯টি সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন, ১৫টি আংশিক বাস্তবায়ন ও বাকি ১৫টি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পক্ষান্তরে জনসংহতি সমিতিকে শুধু দুটি ধারার কথা বলা হয়েছিল বাস্তবায়ন করতে। একটি—তাদের সব অস্ত্র আত্মসমর্পণ এবং দ্বিতীয়টি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ছেড়ে দিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে আসা। কিন্তু তারা একটিও বাস্তবায়ন করেনি।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পর নতুন করে বিভাজন শুরু হয়। এ চুক্তি পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি মেটায়নি, এমন কথা বলে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, গণপরিষদ এবং হিল উইমেন্স ফেডারেশনের একটা অংশ চুক্তির বিরোধিতা করে একটা দল গঠন করে। নাম দেওয়া হয় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রটিক ফ্রন্ট ( ইউপিডিএফ)। এই সংগঠনের সঙ্গে জেএসএসের দ্বন্দ্ব–সংঘাতের জেরে এখনো পাহাড়ে রক্ত ঝরছে।
২০০৭ সালে জেএসএস ভেঙে তৈরি হয় জেএসএস (এম এন লারমা)। ২০১৭ সালের নভেম্বরে ইউপিডিএফ ভেঙে তৈরি হয় ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)। এরপর সংঘাত ও খুনাখুনি আরও বেড়ে যায়।
উপজাতিদের অধিকারের দাবি রেখে পিসিজেএসএস রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা হলেও তার অন্তরালে রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা, অব্যাহত চাঁদাবাজি, সশস্ত্র কার্যক্রম, হানাহানি, খুন-গুম করে সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামকে অশান্ত করে আসছে।
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও জাতিগত ভেদাভেদ সৃষ্টি করে জেএসএস পাহাড়ে প্রায় বসবাস অনুপোযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করেছে আঞ্চলিক এ সশস্ত্র দলগুলো। পার্বত্য চট্টগ্রামের সেই শান্তিবাহিনী বিভিন্ন দল উপদলে বিভক্ত হয়ে চাঁদাবাজি, হানাহানি, রক্তারক্তি সংঘর্ষ ও অবৈধ অস্ত্রের জোর খাটিয়ে পার্বত্য অঞ্চলের জনজীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে। এই জেএসএস পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩৮ হাজার নিরস্ত্র বাঙালিকে হত্যা করেছে। ২৭টি গণহত্যা পার্বত্য চট্টগ্রামে চালিয়েছে। এসব ঘটনার দায় অবশ্যই জেএসএসকে নিতে হবে। সেইসাথে ইউপিডিএফসহ বাকি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর অপকর্মের দায়ও জেএসএসকে বহন করতে হবে। কেননা জেএসএস সৃষ্টি হয়েছে বলেই অন্যান্য আঞ্চলিক সন্ত্রাসী দলগুলোর সৃষ্টি হয়েছে।
-অরবিন্দ বাগচি

