পাকিস্তানি গুপ্তচর বাহিনী ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টিলিজেন্স বা আইএসআই বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পগুলিকে জঙ্গিবাদীদের আস্তানায় পরিণত করতে চাইছে বলে সংবাদ ছেপেছে বাংলাদেশের জনপ্রিয় পত্রিকা দৈনিক ইত্তেফাক। গত .. ‌মে ২০২৪ ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে বেরিয়ে এসেছে এই তথ্য।  র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন বা র‌্যাবের অভিযানে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
রেপিড একশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) এর বরাত দিয়ে ইত্তেফাক লিখেছে অত্যাধুনিক অস্ত্র-সহযোগে বাংলাদেশের মাটিকে ফের জঙ্গিবাদী রাজনীতির আস্তানা করে তোলার চেষ্টা চলছে। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীরা রোহিঙ্গাদের ওপর বিশেষ নজরদারি চালাচ্ছেন। র‌্যাবের অভিযানে সাফল্যও আসছে।
কক্সবাজারে উখিয়া থানার গহিন পাহাড়ে জঙ্গিবাদীদের আস্তানায় গত ১৫ মে অভিযান চালায় বাংলাদেশের এলিট বাহিনী র‌্যাব। র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক আরাফাত ইসলাম মিডিয়া ব্রিফিংএ জানান, আস্তানাটি ছিল মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান স্যালভেশন আর্মির (আরসা)। সেই অভিযানে আরসার আস্তানা থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গ্রেনেড ও রকেট সেল উদ্ধার হয়। গ্রেপ্তার করা হয়েছে আরসার দুই কট্টর সন্ত্রাসবাদীকে।
আটককৃতরা হলেন উখিয়ার ১৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা মো শাহনুর ওরফে মাস্টার সলিম (৩৮) ও বালুখালী ক্যাম্পের বাসিন্দা মো রিয়াজ (৩৫)। মাস্টার সলিম ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে বালুখালী ক্যাম্প-১৫তে বসবাস শুরু করেন।
এর আগে আরসা প্রধান আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনির দেহরক্ষী হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশে আরসা নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ায় মাস্টার সলিমকে আরসার প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সলিমের বিরুদ্ধে তিনটি হত্যাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। রিয়াজের বিরুদ্ধেও একটি হত্যার মামলা রয়েছে। উদ্ধার করা বেশিরভাগ অস্ত্রই বিদেশ থেকে আমদানি করা। আটকদের জেরা করে আরও তথ্য জানতে চাইছেন গোয়েন্দারা।
কক্সবাজারের ৩২টি ক্যাম্পেই অপরাধমূলক কাজকর্ম চলছে। সেখানে বেড়েই চলেছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাকিস্তানি গুপ্তচরদের আনাগোনার বিষয়টিও বিশেষভাবে চর্চিত- এমন অভিযোগ উঠছে। এমনকি, একাধিক মৌলবাদী সংগঠনের সঙ্গেও রোহিঙ্গাদের যোগাযোগ রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। সবমিলিয়ে দেশের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো।
রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পে গত দেড় বছরে ৮০ জন খুন হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে ৬৪ জন ও এবছর এখন পর্যন্ত আরও ৩৩ জন হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন। মে মাসের প্রথমার্ধেই ক্যাম্পগুলোতে চার কমিউনিটি নেতাসহ ১৭ জন রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়। রোহিঙ্গাদের নিজেদের মধ্যেই বিরোধ তুঙ্গে। তাই সেখানে একে অন্যকে খুন করছে। পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক।
সবধরনের অপরাধের সঙ্গেই যুক্ত মিয়ানমার থেকে আসা এই শরণার্থীরা। তাদের সামলাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীরা সচেষ্ট থাকলেও বিদেশি মদদে অপরাধমূলক কাজকর্মের ঠিকানা হয়ে উঠছে এই ক্যাম্পগুলো।
আওয়ামী লীগের মানবিক সরকার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিপদে ফেলতে চায় না। কিন্তু রোহিঙ্গারা নিজেরাই বাংলাদেশের জন্য নিত্য নতুন সমস্যা তৈরি করছে। বিদেশিদের মদদে তারা জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও ক্ষতিকারক হয়ে উঠছেন। তাদের অপকর্মের শিকার হচ্ছেন বাংলাদেশিরাও।
তরুণী-যুবতীদের দিয়ে দেহ ব্যবসার পাশাপাশি বিদেশে পাচার-বাণিজ্য শুরু করেছে তারা।
এছাড়াও চুরি-ছিনতাই মারাত্মক হারে বেড়ে গেছে। প্রায়ই নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি হচ্ছে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে। ফলে দিন দিন সমস্যা বেড়ে চলেছে। বেশ কিছুদিন ধরে আরসার তৎপরতাও বেড়েছে চোখে পড়ার মতো। আরসার সঙ্গে রয়েছে আইএসআইয়ের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ।
উখিয়ায় ক্যাম্পে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে ১৪ মে সোমবার উখিয়ার একটি ক্যাম্পের হেড মাঝি মোহাম্মদ ইলিয়াসকে (৪৩) ঘর থেকে তুলে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে আরসার বিরুদ্ধে।
এর আগে, ১১ মে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার রোহিঙ্গা শিবিরে দুষ্কৃতীদের গুলিতে আলম নামে এক রোহিঙ্গা যুবক নিহত হয়। এই হত্যাকাণ্ডের পিছনেও উঠছে আরসার নাম। রোহিঙ্গাদের নিজেদের মধ্যেকার অশান্তি এবং অপরাধমূলক কাজকর্ম আমাদের ক্ষতির কারণ হয়ে উঠছে। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা সম্প্রতি রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে একাধিক সমস্যা চিহ্নিত করেছেন।
রোহিঙ্গাদের কারণে পরিবেশগত ও আইনশৃঙ্খলার সমস্যার বিষয়টিও উল্লেখ করেন তারা। রোহিঙ্গাদের অনেকেই তরুণী ও মাদক পাচার এবং অবৈধ কারবারিতে যুক্ত রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। রোহিঙ্গাদের একটা বড় অংশ মাদক চোরাকারবারের সঙ্গে যুক্ত। তারা বাংলাদেশের যুব সম্প্রদায়কে আকৃষ্ট করছে মাদক সেবনে। ফলে দেশের তরুণ প্রজন্ম ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই মাদক চোরাকারবারের সঙ্গে রয়েছে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ। সহজেই প্রচুর অর্থ উপার্জনের লালসায় তারা শুধু আমাদের তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে তাই নয়, নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হচ্ছে। কারণ মাদকের পাশাপাশি তারা এখন অস্ত্র চোরাকারবারেও হাত লাগিয়েছে।
প্রথমে 'হারাকাহ আল ইয়াকিন' নামে প্রচারণা চালালেও পরবর্তীতে নাম বদল করে 'আরাকান রোহিঙ্গা সলভেশন আর্মি' বা আরসা নামে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালু রাখে।  হারাকাহ আল ইয়াকিন বা আরসার প্রতিষ্ঠাতা আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনজুনি ওরফে হাফিজ তোহার এর জন্ম পাকিস্তানে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জেএমবি, হরকাতুল জিহাদ ও হিজবুত তাহরীর এর মত উগ্রবাদী সংগঠনের।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশিদ বহুদিন আগেই বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই সবসময় বাংলাদেশ নিয়ে নেতিবাচক কাজ করে থাকে। আরসা প্রধান আতাউল্লাহ পাকিস্তানি হওয়ায় এ এলাকায় অস্থিরতা সৃষ্টি করতে বিশেষ সহায়ক। পাকিস্তানি প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার সার্ভিস ইন্টেলিজেন্স (আইএসআই) সংস্থা অস্ত্র ও অর্থ দুটোই সরবরাহ করছে’।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাউন্টার ইন্টিলিজেন্স বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক।
এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও বহুদিন আগে স্বীকার করেন, ‘রোহিঙ্গারা দিন দিন বিষফোঁড়া হয়ে যাচ্ছে। আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার সর্বাত্মক চেষ্টা করছি’। চেষ্টা চলছে। কিন্তু দ্রুততার সঙ্গে আইএসআইয়ের প্রভাবমুক্ত করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলির অপরাধমূলক কার্যকলাপ বন্ধ করতে হবে। নইলে বিপদ আমাদের।

সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক