ছেলেদের বয়স যখন পাঁচ বছর তখন স্বামীকে হারিয়েছেন আর্জিনা বেগম। স্বামীকে হারিয়ে সংসারে অর্থের টানাপোড়ন থাকলেও সন্তানদের পড়ালেখা বন্ধ করেননি। জমি বন্ধক রেখে সন্তানদের পড়ালেখা চালিয়ে নিয়েছেন। সন্তানরাও মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মায়ের মুখে হাসি ফুটেয়েছেন।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, মাফিউল, সাফিউল ও রাফিউল তিন জনই যমজ সহদোর। এক পরিবারের তিন ভাই চিকিৎসক হতে যাচ্ছেন, এমন খবরে শুধু বগুড়ার ধুনট উপজেলায় নয়, পুরো জেলা ও দেশে আলোচনা চলছে।
মাফিউল হাসান গত বছর ঢাকার সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এবার সাফিউল হাসান দিনাজপুর মেডিক্যালে কলেজ হাসপাতালে এবং রাফিউল হাসান নোয়াখালী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন।
জানা গেছে, বগুড়ার ধুনটের সদর ইউনিয়নের বথুয়াবাড়ি গ্রামের স্কুলশিক্ষক গোলাম মোস্তফা ও গৃহিণী আর্জিনা বেগম দম্পতির ঘরে গত ২০০৪ সালের ৩০ নভেম্বর তিন যমজ সন্তানের জন্ম হয়। প্রথমে সাফিউল হাসান সাফি, এর কিছুক্ষণ পর মাফিউল হাসান মাফি ও রাফিউল হাসান রাফির জন্ম হয়। তাদের সংসারে আরও এক ছেলে ও এক মেয়ে সন্তান রয়েছে।
২০০৯ সালে স্থানীয় মাঠপাড়া উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক গোলাম মোস্তফা হৃদরোগে মারা যান। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে সন্তানরা হয় এতিম। মা আর্জিনা বেগম সন্তানদের লেখাপড়া ও ভরণপোষণের সব দায়িত্ব মাথায় নেন। স্বামীর রেখে যাওয়া বাঙালি নদীর তীরে ছয় বিঘা জমি ও বাবার বাড়ি থেকে পাওয়া কিছু সম্পত্তেই ছিল তাদের সম্বল।
সন্তানদের প্রকৃত শিক্ষা দিতে আর্জিনা বেগম শুরু করেন সম্পত্তি বিক্রি। এ ছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও তাদের পাশে দাঁড়ায় তখন।
যমজ এ তিন ভাই ২০২০ সালে ধুনট সরকারি নইম উদ্দিন পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি পাস করেন। এরপর বগুড়া সরকারি শাহ সুলতাল কলেজ থেকে ২০২২ সালে জিপি-এ ৫ পেয়ে এইচএসসিতে উত্তীর্ণ হন। তিন সহোদরের অভাবনীয় সাফল্যে শুধু বথুয়াড়ী গ্রাম নয়, গোটা উপজেলায় যেন আনন্দের জোয়ার বইছে।
আরজিনা বেগম জানান, তার স্বামী গোলাম মোস্তফা স্থানীয় মাঠপাড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। ২০০৯ সালে তিনি মারা যান। স্বামী মারা যাওয়ার পর তিন ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে তিনি অকূল পাথারে পড়েন। মেয়ে মৌসুমী বগুড়া সরকারি আজিযুল হক কলেজে স্নাতকে অধ্যয়নরত। তিনি আরও বলেন, ‘আমার জমি না হয় শেষ হয়েছে তবুও এতিম ছেলে ও মেয়েকে মানুষের মতো মানুষ হওয়ার রাস্তায় দিয়েছি। তবে অভাব-অনটনের সংসারে মেয়ে মৌসুমীকে কীভাবে বিয়ে দেবেন এবং যমজ তিন ছেলের লেখাপড়ার খরচ কীভাবে বহন করবেন সেই চিন্তা তাড়া করে ফিরছে রত্নগর্ভা এ মায়ের।
তিনি আরো বলেন, মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তার সন্তানরা এতিম হয়। তারা বাবার স্নেহ ও ভালোবাসা পায়নি। আমার স্বামীর রেখে যাওয়া ও বাপের বাড়ির থেকে পাওয়া সম্পত্তি বিক্রি করে তাদের লেখাপড়ার খরচ জুগিয়েছি।
সন্তানদের নিয়ে গর্ব করে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ছেলেদের চিকিৎসক বানাতে প্রয়োজনে আর যা আছে, তা বিক্রি করবেন। সন্তানরা চিকিৎসক হয়ে যাতে গরিব মানুষের সেবা করতে পারে, সে দোয়া করি।
গত বছর সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হওয়া মাফিউল হাসান মাফি জানান, তারা তিন ভাই বগুড়ায় মেসে থেকে সরকারি শাহ্ সুলতান কলেজের পড়েছেন। তাদের মা অনেক কষ্ট করে জমিজমা বিক্রি করে তাদের পড়িয়েছেন। তিন ভাই একসঙ্গে চিকিৎসক হবেন, এটা ভাবতে অনেক ভালো লাগছে।
এ বছর দিনাজপুর মেডিক্যালে ভর্তির সুযোগ পাওয়া সাফিউল হাসান বলেন, ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছি। মা আমাদের দেখভাল করেছেন। আজ বাবা থাকলে অনেক খুশি হতেন। চিকিৎসক হয়ে যেন মানুষের সেবা করতে পারি, সে জন্য দোয়া চাই।
-পার্বত্য সময়

