গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. নাসির উদ্দীন বলেছেন, রোহিঙ্গা সমস্যা খুব দ্রুত সমাধান হবে বলে আমি মনে করি না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অন বাজেট অ্যান্ড পলিসি আয়োজিত 'রোহিঙ্গা সংকটের নতুন মোড়: ভূরাজনীতি, মানবিক সহায়তা এবং প্রত্যাবাসন' শীর্ষক এক ভার্চুয়াল আলোচনায় তিনি এ মন্তব্য করেন।  
তিনি বলেন, মিয়ানমারে যে সংঘাত হচ্ছে আর পরিণতি কি হবে তা আমাদের জানা নেই। আর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী খুব দ্রুত পরাজিত হবে এমনটা মনে করবারও কোনো কারণ নেই। মিয়ানমার রাষ্ট্রের কাঠামোর ভেতরে সেনাবাহিনীর যে কর্তৃত্ব, নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য সেটা যদি জারি থাকে এবং নতুন যদি কোনো ডেমোক্রেটিক গভর্নমেন্ট ক্ষমতায় আসেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি সহসা সমাধান হচ্ছে না।
মিয়ানমারের বর্তমান রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে নৃবিজ্ঞানের এ অধ্যাপক বলেন, মিয়ানমারে বর্তমানে গৃহযুদ্ধ চলছে। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভের সময় থেকে দেশটি এক দীর্ঘ গৃহযুদ্ধে লিপ্ত আছে। বার্মার সাথে অন্যান্য জাতিগুলোর সাথে সব সময় সংঘাত লেগেই থাকতো। ১৯৬২ সালে দেশটিতে প্রথম সামরিক সরকার ক্ষমতা দখল করে। এরপর থেকে রাষ্ট্রের সাথে বিভিন্ন জাতির লড়াই লেগেই ছিলো। এরপর ২০১৫ সালে সুচির নেতৃত্বে   ‘ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি’ যখন ক্ষমতায় আসে সে সময় থেকে ডেমোক্রেটিক হাওয়া বইতে শুরু করে কিন্তু সেটিও ২০০৮ সালের সংবিধানের ভিত্তিতে রাষ্ট্রের যে কাঠামো দাঁড়ায় সেটি খুবই অদ্ভুত ছিল। যেমন ২৫% সিট মিলিটারির জন্য রিজার্ভ করা থাকবে, ৩টি গুরুত্বপূর্ণ মিনিস্টিরি মিলিটারিকে দিতে হবে এবং ভাইস প্রেসিডেন্টের মধ্যে একজনকে মিলিটারির মধ্যে দিতে হবে। এরকম নানান ধরনের পদ মিলিটারিকে দিতে হবে এমন শর্তে আসতে হয় মিয়ানমারকে। 
তিনি বলেন, ২০২০ সালের নভেম্বরের ৮ তারিখ যখন ন্যাশনাল ইলেকশন হয় সেখানে ‘ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি’ ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। তখন সারা দুনিয়া মনে করেছিল, মিয়ানমার সাময়িক গণতন্ত্র থেকে একটা চিরস্থায়ী গণতন্ত্রের দিকে ধাপিত হচ্ছে। কিন্তু ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারির ১ তারিখ নতুন পার্লামেন্ট যখন গঠন করবে সেদিনই মিলিটারি ক্ষমতা দখল করে। তাদের ক্ষমতা দখলের পরের পরিতস্থিতি আগের পরিস্থিতির মতন ছিল না। মিলিটারির ১৯৬২,১৯৮৮ ও ১৯৯২ সালের ক্ষমতা দখলের সাথে ২০২০ সালের ক্ষমতা দখলের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এর কারণ এবার জনগণ সিরিয়াস একটা প্রতিক্রিয়া দেখায়। 
ড. নাসির উদ্দীন মনে করেন, ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্টের পিপল ডিফেন্স ফোর্স (পিডিএফ) ছাড়াও জান্তা বিরোধী অন্যান্য বিদ্রোহী গ্রুপগুলো দেশটির জনগণের সাথে সমন্বয় করে দারুণ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। থ্রি-বাদ্রারহুড এলায়েন্সের কথা উল্লেখ করে তাদের বিভিন্ন টাউনশিপ দখলের কথা তুলে ধরেন।
বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী এবং রোহিঙ্গাদের বাসস্থান রাখাইনের বর্তমান অবস্থা নিয়ে এ গবেষক বলেন,  থ্রি ব্রাদার হুড এল্যায়েন্স ওয়ান জিরো টু সেভেন অপারেশনে যে কাজ করছে তার মধ্যে আরাকান আর্মি অন্যতম। তারা ইতমধ্যে  ৮টি টাউনশিপ দখল করেছে এবং মিয়ানমারের বিভিন্ন সেনাবাহিনীর সিমান্ত চৌকি এবং বেজগুলো দখল করে নিয়েছে। তারা রাখাইনের রাজধানী দখল করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এতে করে বোঝা যাচ্ছে আরকান আর্মির কারণে সেখানের সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং আরাকান সেটি নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছে। 
মিয়ানমারভিত্তিক সংবাদপত্র ইরাবতীর বরাত দিয়ে তিনি বলেন, অলমোস্ট রাখাইনের ৭০% আরাকান আর্মি দখল নিয়েছে। তারা যদি পুরো রাখাইন দখল করে ফেলে এবং অন্যান্য গ্রুপগুলো যদি মিয়ানমারে ডমিনেন্ট পজিশনে আসে তাহলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন খুব সহজে আলোর মুখ দেখবে বলে আমি মনে করি না। বর্তমানে বাংলাদেশে ১.৩ মিলিয়ন শরণার্থী বাস করছে। তাদেরকে ফেরত পাঠানোই যদি আমাদের প্রধান লক্ষ্য হয় তাহলে আমার মতে, খুব দ্রুত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কোনো আশার আলো আমি দেখছি না।
তিনি আরও বলেন, প্রবাসী সরকার গঠন করা হয়েছে সেখানে ডেপুটি হিউম্যান রাইটস মিনিস্টার এর পদ দেওয়া হয়েছে একজন রোহিঙ্গা এক্টিভিস্টকে। যখন বাংলাদেশ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আগুন লাগে তখন ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট একটি অফিশিয়াল স্টেটমেন্ট দেয়, যেখানে লেখা ছিল আমরা রোহিঙ্গাদের সাথে একাত্মতা পোষণ করছি, আমরা খবই সমবেদনা জানাচ্ছি। কিন্তু  এটি সাময়িক, আমরা দীর্ঘমেয়াদী কাজ করতে চাই। রোহিঙ্গাদের যা হয়েছে সেটার জন্য আমরা দুঃখিত। ভবিষ্যতে আমরা তাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য আমরা কনসিডার করতে চাই। অন্যদিকে আরাকানের প্রধান বলার চেষ্টা করছে তারা রোহিঙ্গাদের সাথে কাজ করবে একসাথে এবং তাদেরকে দেশে ফিরিয়ে নেবে। রোহিঙ্গাদের জন্য তাদের যেই ভালোবাসা সেটা হইতো পশ্চিমা বিশ্বের কাছে থেকে তাদের প্রতি একটা পজেটিভ চিন্তা তৈরি করে নেওয়া। কারণ আন্তর্জাতিকভাবে রোহিঙ্গাদের প্রতি পশ্চিমা বিশ্বের একটা সংবেদনশীলতা রয়েছে। 
এ গবেষক মনে করেন, রোহিঙ্গাদের নিয়ে তাদের এই ভালোবাসা অনেকটা পলিটিক্যাল স্ট্র্যাটেজি।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মারুফুল ইসলাম। অন্যান্য আলোচকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. নিলয় রঞ্জন বিশ্বাস এবং বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আই'র জ্যেষ্ঠ বার্তা সম্পাদক মীর মাসরুর জামান। এছাড়াও অনলাইনে অন্তত ৫ শতাধিক শ্রোতা সরাসরি অংশগ্রহণ করেন।
-পার্বত্য সময়