মিয়ানমারের সেনাবাহিনী উত্তর রাখাইন রাজ্যে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক অভিযান শুরু করে। যে কারণে জীবন বাঁচাতে নিজ দেশ ত্যাগ করে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা। জন্মভূমি ছেড়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অবস্থানের সাত বছর পার হলেও বন্ধ হয়নি নাফ নদীর ওপারে যুদ্ধ।
মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে মায়ের কোলে করে বাংলাদেশে চলে আসা শিশুরা এখন বড় হচ্ছে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। বাবা-মায়ের মুখে সেই ভয়াবহতার গল্প শুনে শুনে বড় হওয়া এই শিশুরা মনে করে, তারা সেই যুদ্ধের মধ্যেই আছে। ক্যাম্পের জীবনও তাদের জন্য একটা ‘যুদ্ধক্ষেত্র’।
বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার যৌথ ফ্যাক্ট শিটের জানুয়ারির হিসাব বলছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বর্তমান জনসংখ্যা ৯ লাখ ৭৫ হাজার ৩৫০। এরমধ্যে ৫২ শতাংশই শিশু। সেই শিশুদের মধ্যে ৫ বছর থেকে ১১ বছরের ২১ শতাংশ, আর ১২ বছর থেকে ১৭ বছরের ১৫ শতাংশ শিশুর উল্লেখ আছে।
উখিয়া, ক্যাম্প-৭ এ ১১ বছর বয়সী এক শিশু চার বছর বয়সে থাকতে এ দেশে এসেছে মায়ের কোলে চড়ে। এরপর সে জেনেছে, যেখানে সে থাকে সেটা তার নিজের জায়গা না। ওই দূর পাহাড়ে তাদের দেশ। তবে সেখানে যাওয়ার সুযোগ নেই। কোনো একদিন হয়তো ফিরতে পারবে, কিন্তু কোথায় ফিরবে? মায়ের মুখে গল্প শুনেছে সেখানে নিজেদের তিন কক্ষের একটি বাড়ি আছে, চাষের জমি আছে, অন্য আত্মীয়রাও কেউ কেউ আছে।
ক্যাম্প-৯ এর ছেলেদেরকে প্রশ্ন করা হয় ‘কেমন কাটে ক্যাম্পে?’ প্রশ্নের জবাবে এদের মধ্যে সবচেয়ে বড়জন ১৪ বছর বয়সী একজন বলে, ‘আমরা ছোট থেকে সবচেয়ে বেশি শুনেছি যুদ্ধের কথা। আমাদের আসল বাড়ি যেখানে, সেখানে যুদ্ধ চলছে। তাই আমরা এখানে আছি। কিন্তু ক্যাম্পজীবনও তো যুদ্ধই। খাওয়ার ব্যবস্থা, থাকার ব্যবস্থা অন্য কেউ করে দেয়। হিসাব করে খাবার দেয়, খাবার কমিয়ে কমিয়ে দেয়। পানি এক জায়গায় গিয়ে লাইন ধরে জোগাড় করতে হয়— এসব যুদ্ধই। কেন আমরা এখানে সেই উত্তরও আমাদের কাছে নেই।
এই ক্যাম্পের মেয়েদের দলের ১১ বছরের এক সদস্য বলেন, ‘এখানেও আমাদের ভয়ে দিন কাটে। ইচ্ছেমতো চলার স্বাধীনতা নেই। সবাই কমবেশি চেনা, কিন্তু অচেনা মানুষও অনেক। আমাদের কেউ বিশ্বাস করে না। আমার অনেক বন্ধুর বিয়ে হয়ে গেছে। কতজনকে ক্যাম্প থেকে লুকিয়ে অন্যখানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে’।
অন্যদেইকে ক্যাম্প-১ এর ছেলেদের দল রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ১১ থেকে ১৪ বছরের সাত শিশুর তিন জনই ফিরে যাওয়ার আন্দোলনের মিছিল-মিটিংয়ে নিয়মিত। মিয়ানমারে এখনও যুদ্ধ চলছে, তাহলে তারা ফিরতে চান কেন— প্রশ্নে তাদের একজন বলছেন, ‘আমরা এখান থেকে বের না হলে আমাদের কোনও ভবিষ্যৎ নেই। এখানে কেউ মারবে না আমাদের, কিন্তু বসে বসে যেটুকু সাহায্য পাবো, সারাজীবন সেটাই খাবো? নিজের জায়গায় যুদ্ধ করে হলেও সেখানেই থাকতে চাই।’
নিজ দেশে ফেরার বিষয়ে প্রশব করলে এখানকার মেয়েদের দলটির সবচেয়ে বড়জন ১৩ বছরের একজন বলেন, ‘এখানে কেউ ঘর পুড়িয়ে দিচ্ছে না বলে যুদ্ধ নাই, তা তো না। আমাদের জীবনটাই যুদ্ধের। সাত বছর হয়ে গেছে, এখন চলে যাবো নিজের জায়গায়। মা বলে— এখানে বন্দি জীবনে রোজ যুদ্ধ। এই কেউ মারা যাচ্ছে, এই আগুন লেগে যাচ্ছে, মিছিল মিটিং করলেও ভয়ে ভয়ে করতে হয়।’
শিশু অধিকারকর্মী গওহার নঈম ওয়ারা মনে করেন, এই শিশুদের প্রতি নানাবিধ অন্যায় করা হচ্ছে। তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ মনোসামাজিক অবস্থান নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই বন্দিজীবন, এই অপরাধপ্রবণ পরিবেশ তাদের প্রাপ্য না। তাদের যদি ট্রাভেল ডকুমেন্ট করে দেওয়া যায় তাহলে যে অবৈধ অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ওঠে, সেখান থেকে তারা রক্ষা পায়। শিশুদের জন্য সর্বোচ্চটা করতে চাওয়া এবং পারা আমাদের উচিত। যেহেতু এখনই তাদের পাঠিয়ে দিতে পারছি না, সেহেতু ভাষাগত দূরত্ব যেন না থাকে, সেসব নিয়েও আমাদের পরিকল্পনা দরকার।
গোসল থেকে শুরু করে পানি সংগ্রহ সবকিছুতে লাইন দেওয়া, উচুঁনিচু পথে গিয়ে খাবার সংগ্রহ এসব তাদের যুদ্ধই মনে হয়। একটু সুবিধা বঞ্চিত যেন না হতে হয়, তা নিয়ে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব দেখে বড় হচ্ছে শিশুরা।
‘ক্যাম্প-জীবন তো স্বাভাবিক জীবন হওয়ার কোনও সুযোগ নেই’ উল্লেখ করে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কার্যালয়ের অতিরিক্ত কমিশনার শামসুদ্দৌজা বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করি তাদের নানাবিধ অ্যাক্টিভিটির মধ্যে রাখতে। ফুটবল খেলার আয়োজন করা হয় কমিশনের পক্ষ থেকে। তারপরেও ক্যাম্প তো ক্যাম্পই। তাদের ফিরে যাওয়া নিয়ে নানা রাজনীতি আছে, সেসব কথা শিশুদের কানে যায়। তারা মানসিকভাবে বিভ্রান্ত বোধ করতে পারে।’
-পার্বত্য সময়
জন্মভূমি থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের জীবন যুদ্ধ চলছেই
আমরা এখান থেকে বের না হলে আমাদের কোনও ভবিষ্যৎ নেই। এখানে কেউ মারবে না আমাদের, কিন্তু বসে বসে যেটুকু সাহায্য পাবো, সারাজীবন সেটাই খাবো? নিজের জায়গায় যুদ্ধ করে হলেও সেখানেই থাকতে চাই।’
সি
স্টাফ রিপোর্টার
১৯ মে, ২০২৪ ৮:৪৫ পূর্বাহ্ন৩ মিনিট পড়া

ছবি: সংগৃহীত
