দেশকে উন্নতির দ্বারপ্রান্তে নিতে একের পর এক মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করছে বর্তমান সরকার। প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে স্বস্তি ফিরেছে জনজীবনে। বিদায়ী ২০২৩ সালেও স্বপ্ন ছুঁয়েছে বেশ কিছু প্রকল্প। এসবের মধ্যে ছিল মেট্রোরেল, বঙ্গবন্ধু টানেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ, মাতারবাড়ী সমুদ্র বন্দর চ্যানেল, পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা-কক্সবাজার রুটে রেল এবং সারাদেশে বহু মডেল মসজিদ নির্মাণসহ বেশ কিছু প্রকল্প।
মেট্রোরেলঃ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চলতি বছরের ৪ নভেম্বর আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত বহুল প্রতীক্ষিত মেট্রোরেল সার্ভিসের দ্বিতীয় ধাপের উদ্বোধন করেন। এরপর ৫ নভেম্বর থেকে উত্তরা-মতিঝিল রুটে প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত চলছে মেট্রোরেল। বেলা সাড়ে ১১টার পর মতিঝিল-আগারগাঁও রুটে চলাচল বন্ধ থাকলেও উত্তরা-আগারগাঁও সেকশনে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত চলছে মেট্রোরেল।
২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রোরেলের প্রথম ধাপের উদ্বোধন করা হয়। মূলত যানজট নিরসনে রাজধানীজুড়ে মেট্রোরেল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। মেট্রোরেলের সর্বনিম্ন ভাড়া নির্ধারণ করা হয় ২০ টাকা আর সর্বোচ্চ ভাড়া ১০০ টাকা।
উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মোট ১৭টি স্টেশন চালু হলে এই ২১.২৬ কিলোমিটার পথ ভ্রমণ করতে মেট্রোরেলের মোট সময় লাগবে মাত্র ৪০ মিনিট। মেট্রোরেল প্রতি ঘণ্টায় ৬০ হাজার যাত্রী এবং প্রতিদিন ৫ লাখ যাত্রী বহন করতে সক্ষম হবে এবং প্রতি চার মিনিটে প্রতিটি স্টেশনে একটি ট্রেন আসবে।
জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) মেট্রোরেল নির্মাণ করছে। আর প্রকল্পে সহজ শর্তে ঋণ সহায়তা দিচ্ছে। জাইকা প্রকল্পের জন্য ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা দিয়েছে।
উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার রেলপথ তৈরির পরিকল্পনা থাকলেও পরে মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত আরও দেড় কিলোমিটারের বেশি দৈর্ঘ্য বাড়ানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ফলে এর খরচ বেড়ে যায় প্রায় সাড়ে এগারো হাজার কোটি টাকা। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এমআরটি-৬ লাইনের সংশোধিত প্রাক্কলিত ব্যয় ৩৩ হাজার ৪৭১ দশমিক ৯৯ কোটি টাকা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলঃ

চলতি বছরের ২৮ অক্টোবর বহুল প্রত্যাশিত চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত দেশের প্রথম যোগাযোগ পথ টানেলের ফলক উন্মোচন করা হয়। এটি উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নদীর তলদেশে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম সড়ক টানেল এটি।
২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি টানেলের খননকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। নির্মাণকাজ শুরুর প্রায় সাড়ে চার বছর পর টানেলের উদ্বোধন করা হয়। টানেলের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উদ্বোধনের পর গাড়ি চলাচল শুরু হয় ২৯ অক্টোবর সকাল ৬টা থেকে।
দেশের প্রথম টানেলের সংযোগ সড়কসহ মোট দৈর্ঘ্য ৯ দশমিক ৩৯ কিলোমিটার। প্রধান টানেলের দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৩২ কিলোমিটার। এ ছাড়া সংযোগ সড়ক ৫ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার লম্বা। আনোয়ারা প্রান্তে থাকা একমাত্র ভায়াডাক্ট বা ওভারপাস ৭২৭ মিটার দীর্ঘ। টানেলের ভেতরে থাকা দুটি টিউব বা সুড়ঙ্গের প্রতিটির দৈর্ঘ্য ২ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার। প্রতিটি টিউবে দুটি করে মোট চারটি লেন রয়েছে।
দেশের প্রথম এ টানেল নির্মিত হয়েছে বাংলাদেশ এবং চীন সরকারের আর্থিক সহায়তায়। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে খরচ হচ্ছে ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার দিচ্ছে ৪ হাজার ৬১৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা। আর চীন সরকার ৬ হাজার ৭০ কোটি টাকা। চীন সরকার এ সহায়তা ঋণ হিসেবে দিচ্ছে। এ ঋণ সুদসহ ফেরত দিতে হবে।
এ ছাড়া টানেলের আগামী পাঁচ বছরের জন্য রক্ষণাবেক্ষণ এবং টোল আদায়ের দায়িত্বও পেয়েছে প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিসিসিসি) লিমিটেড। তাই এ প্রতিষ্ঠানকে দিতে হবে ৯৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে চারটি স্ক্যানার কেনা এবং স্থাপনের কাজে।
এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েঃ

চলতি বছরের ২ সেপ্টেম্বর উদ্বোধন হয়েছে বহুল প্রতীক্ষিত ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। ওইদিন বিকেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক্সপ্রেসওয়ের ১১.৫ কিলোমিটার অর্থাৎ বিমানবন্দর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত অংশের উদ্বোধন করেন। দ্রুতগতির এই উড়ালসড়কের দৈর্ঘ্য ১৯.৭৩ কিলোমিটার।
উদ্বোধনের পর ৩ সেপ্টেম্বর সকাল ৬টা থেকে কাওলা-তেজগাঁও পর্যন্ত অংশে সাধারণ যানবাহন চলাচল করতে খুলে দেওয়া হয়। এই সড়ক দিয়ে বিমানবন্দর থেকে ফার্মগেটে পৌঁছাতে সময় লাগবে মাত্র ১০ মিনিট। যা যানজটের কারণে এখন প্রায় ১ ঘণ্টার মতো লাগে।
শহরের যানজট নিরসন করতে প্রকল্প হাতে নেওয়ার এক দশকেরও বেশি সময় পরে এটির উদ্বোধন করা হয়। বিদেশি বিনিয়োগে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) অধীনে পরিবহন খাতে এটাই প্রথম প্রকল্প। সম্পূর্ণ এক্সপ্রেসওয়ে অর্থাৎ তেজগাঁও-কুতুবখালী পর্যন্ত ২০২৪ সালের জুনে চালু করার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।
কাওলা থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত অংশে ওঠা নামার জন্য মোট ১৫ টি র্যাম্প থাকবে। এর মধ্যে ১৩টি র্যাম্প ৩ সেপ্টেম্বর যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। আর পুরো উড়ালসড়কে ৩১টি স্থান দিয়ে যানবাহন ওঠানামা (র্যাম্প) করতে পারবে।
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে শহরের যানজট কমাতে যে দুটি এক্সপ্রেসওয়ে তৈরি করা হচ্ছে তার মধ্যে একটি। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, উড়ালসেতুর সম্পূর্ণ সুবিধা পেতে দুটি এক্সপ্রেসওয়ে চালু হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। দুটি এক্সপ্রেসওয়ে চালু হলে বাংলাদেশের উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে ঢাকা হয়ে যাতায়াতের সময় রাজধানীর যানজট এড়ানো সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এ ছাড়া ট্রাক এবং লরি, যা এখন দিনের বেলা শহরে প্রবেশ করতে পারে না, সেগুলোও এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করতে পারবে।
পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগঃ

চলতি বছরের ১০ অক্টোবর পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা-ভাঙ্গা রুটে নতুন ট্রেন সার্ভিস উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রকল্পের বিবরণ অনুযায়ী, বাংলাদেশ রেলওয়ে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের আওতায় ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ১৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন রেল ট্র্যাক নির্মাণ করছে। এর ৮২ কিলোমিটার অংশ ঢাকা ও ভাঙ্গাকে সংযুক্ত করে, যা ১০ অক্টোবর খুলে দেওয়া হয় এবং এর যশোর সংযোগকারী অবশিষ্ট অংশটি আগামী বছরের জুনে চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গত বছরের জুনে যুগান্তকারী পদ্মা সেতু উদ্বোধনের এক বছর দুই মাস পর পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা-ভাঙ্গা রেল সার্ভিস উদ্বোধন করা হয়। গত ৭ সেপ্টেম্বর পদ্মা সেতু দিয়ে ঢাকা-ভাঙ্গা রুটে বিশেষ ট্রেনের ট্রায়াল সম্পন্ন হয়।
এর আগে, পদ্মা সেতুতে পাথরহীন রেললাইনের কাজ শেষ হওয়ার পর গত ৪ এপ্রিল ভাঙ্গা থেকে পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্ত পর্যন্ত ট্রায়াল ট্রেন চালায় বাংলাদেশ রেলওয়ে। গত বছরের ১৪ অক্টোবর ‘পদ্মা সেতু রেল সংযোগ নির্মাণ প্রকল্প’র আওতায় ঢাকা ও যশোরের মধ্যে রেল সংযোগ নির্মাণকাজের উদ্বোধন করা হয়। এটি উদ্বোধন করেন প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এতে ২১ হাজার ৩৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা ঋণ দিচ্ছে চীনের এক্সিম ব্যাংক।
সমাপ্ত হওয়ার পর রেল যোগাযোগ পদ্মা সেতুর মাধ্যমে দেশের মধ্য এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী শহরের প্রবেশ পথ আরও বর্ধিত হবে—যা মুন্সিগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও নড়াইল জেলার নতুন এলাকাকে যুক্ত করবে বলে প্রকল্পের বিশদ বিবরণে উল্লেখ করা হয়। প্রকল্পটি ঢাকা-যশোর-খুলনাকে ২১২ দশমিক শূন্য পাঁচ কিলোমিটার সংক্ষিপ্ত রুট দিয়ে বিকল্প রেলপথ সংযোগ স্থাপন করবে।
মাতারবাড়ী সমুদ্র বন্দর চ্যানেলঃ

এ বছরের ১১ নভেম্বর কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে বহুল প্রতীক্ষিত দেশের প্রথম গভীর সমুদ্র বন্দরের চ্যানেল উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে এই চ্যানেলে কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তিনি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এই বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির গেম চেঞ্জার হিসেবে ভূমিকা পালন করবে। জোয়ার-ভাটায় যেকোন সময়ে ৮হাজার টিইইউএস’র জাহাজ ভিড়তে পারবে এখানে। ফলে আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলোর জন্য বাংলাদেশে জাহাজ নিয়োজিত করার সুবিধা বাড়বে। এতে পণ্য পরিবহনে খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে। এ বন্দরকে ঘিরে মাতারবাড়ী-মহেশখালী এলাকায় ব্যাপক শিল্পায়নসহ গড়ে উঠবে অর্থনৈতিক অঞ্চল। ফলে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে, দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকসহ পেশাজীবীদের জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি হবে। দেশের বেকার সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রে এই বন্দর ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬ সালে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই বন্দরের মাধ্যমে ২০২৬ সালের মধ্যে আনুমানিক ০.৬ থেকে ১.১ মিলিয়ন টিইইউস (বিশ ফুট দৈর্ঘ্যের কন্টেইনার) এবং ২০৪১ সালের মধ্যে আনুমানিক ২.২ হতে ২.৬ মিলিয়ন টিইইউস কন্টেইনার কার্গো হ্যান্ডেল করা সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে। মাতারবাড়ী বন্দরকে কেন্দ্র করে এখানে বাণিজ্যিক হাব গড়ে তোলা হবে। চট্টগ্রাম বন্দর যেমন দেশের অর্থনীতির লাইফ লাইন, তেমনি মাতারবাড়ী বন্দরও দেশের অর্থনীতির জন্য আরেকটি প্যারালাল লাইফ লাইনে পরিণত হবে বলেও আশা করা হচ্ছে।
পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়েঃ

চলতি বছরের ১৪ নভেম্বর উচ্চ গতির সড়ক পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশের প্রথম ১৪ লেনের এ সড়কের নাম ‘শেখ হাসিনা সরণি’। এটি উদ্বোধনের মাধ্যমে ঢাকার পূর্ব থেকে পশ্চিমে নতুন সংযোগ তৈরি হয়। যদিও শতভাগ কাজ শেষ হওয়ার আগেই সাধারণের চলাচলের এ পথটা খুলে দেওয়া হয়।
পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ে হলো, ঢাকার নতুন গেইটওয়ে। এটি দেশের প্রথম ১৪ লেনের মহাসড়ক। যার ৮টি এক্সপ্রেসওয়ে। এরই মধ্যে শতভাগ কাজ শেষ; কুড়িল থেকে কাঞ্চন সড়ক বাতির কাজও শেষ। মহাসড়কের দুপাশে রয়েছে ১০০ ফুট খাল। বিশেষ ব্যবস্থা থাকায় ভারি বৃষ্টিতেও এ পথে তৈরি হবে না কোনো জলাবদ্ধতা। এ ছাড়া শহরের জলাবদ্ধতা নিরসন করতেও এই প্রকল্প বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে সড়ক ডিভাইডারে বসেছে ৩৩ হাজার নানা জাতের গাছ। রোড মার্কিংয়ের কাজ শেষ হওয়ায় যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। কুড়িল থেকে কাঞ্চন পর্যন্ত ১২.৩০ কিলোমিটার দেশের প্রথম ১৪ লেনের সড়ক এটি। এই পথে কুড়িল থেকে কাঞ্চন যাওয়া যাবে বিনা বাধায়।
কুড়িল থেকে বালু নদী পর্যন্ত বাকি পথটার দুপাশে আছে আট লেনের রাস্তা। যা আশপাশের এলাকাকে এই সড়কে যুক্ত করবে এবং সঙ্গে রয়েছে দুই পাশের খাল। এটি কেবল এই এলাকা না, ঢাকা উত্তরের একটি বড় অংশের জলাবদ্ধতা নিরসনে সহায়তা করবে।
ঢাকা-কক্সবাজার রুটে রেলঃ

গত ১১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কক্সবাজার রেল সংযোগ উদ্বোধন করেন। এ সময় ডিসেম্বর থেকে দুটি ট্রেন চালুর নির্দেশ দেন তিনি। এরপর ১ ডিসেম্বর দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে ‘কক্সবাজার এক্সপ্রেস’ ঢাকার উদ্দেশ্যে কক্সবাজার আইকনিক রেলওয়ে স্টেশন ছেড়ে যায়। রাত ৯টা ১০ মিনিটে এই ট্রেন ঢাকায় পৌঁছায়। ফিরতি ট্রেন কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে ঢাকার কমলাপুর স্টেশন ছেড়ে যায় রাত সাড়ে ১০টায়।
এই রুটে ট্রেনের গতিসীমা ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১২০ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। কয়েক দফা পরীক্ষামূলক ট্রেন চলাচলের সফল কার্যক্রম শেষে গত ১১ নভেম্বর কক্সবাজার রেল সংযোগ উদ্বোধন করা হয়। এই রুটে ট্রেন চলাচলকে কেন্দ্র করে পর্যটকসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ এবং উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। কক্সবাজারে পর্যটন শিল্পের জন্য তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা।
এই রুটে আপাতত দুটি ট্রেন চলাচল করছে। ট্রেনের সর্বনিম্ন ভাড়া যেটি ধরা হয়েছে সেটি হচ্ছে ১৮৮ টাকা। আর এটি নন এসি মেইল ট্রেন। সর্বোচ্চ ভাড়া এসি বার্থে ১ হাজার ৭২৫ টাকা। বর্তমানে রেলের যে ভাড়ার হার আছে সেই অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়েছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, নতুন এই ট্রেনে মোট ১৬টি কোচ রয়েছে। আসন রয়েছে ৭৮০টি। ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত শোভন চেয়ারের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৯৫ টাকা। এসি চেয়ারের ভাড়া ১ হাজার ৩২৫ টাকা, এসি সিটের ভাড়া ১ হাজার ৫৯০ টাকা এবং এসি বার্থের ভাড়া (ঘুমিয়ে যাওয়ার আসন) ২ হাজার ৩৮০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত শোভন চেয়ারের ভাড়া ২০৫ টাকা, স্নিগ্ধা শ্রেণির ৩৮৬ টাকা, এসি সিটের ৪৬৬ এবং এসি বার্থের ভাড়া ৬৯৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
মডেল মসজিদ উদ্বোধনঃ

এ বছরের ৩০ অক্টোবর দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় ষষ্ঠ পর্বে আরও ৫০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন সৌদি আরবের মদিনার পবিত্র মসজিদ-ই-নববীর ইমাম শায়খ ড. আবদুল্লাহ বিন আব্দুর রহমান আল-বুয়াইজান। নতুন ৫০টি মসজিদ উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে এ পর্যন্ত সারাদেশে ৩০০টি মডেল মসজিদ ও ইলামিক সংস্কৃতিকেন্দ্র উদ্বোধন করা হয়।
এর আগে ২০২১ সালের ৭ ডিসেম্বর প্রথম পর্যায়ে, চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি দ্বিতীয় পর্যায়ে, ১৬ মার্চ তৃতীয় পর্যায়ে, ১৭ এপ্রিল চতুর্থ পর্যায়ে এবং ৩০ জুলাই পঞ্চম পর্যায়ে ৫০টি করে মোট ২৫০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র উদ্বোধন করা হয়।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র:

২০১৩ সালের ১৫ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাশিয়া সফরকালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রস্তুতিমূলক কাজ সম্পাদনের জন্য স্টেট এক্সপোর্ট ক্রেডিট চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। স্বাক্ষরিত আন্তরাষ্ট্রীয় চুক্তি (আইজিএ) এবং স্টেট এক্সপোর্ট ক্রেডিট এগ্রিমেন্টের ভিত্তিতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন (প্রথম পর্যায়) প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। একই বছরের ২ অক্টোবর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রথম পর্যায় কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
২০২৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের ‘ফ্রেশ নিউক্লিয়ার ফুয়েল’ বা ইউরেনিয়ামের প্রথম চালান আসে। ৫ অক্টোবর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমানের কাছে এই ইউরেনিয়াম আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করবেন রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের মহাপরিচালক অ্যালেক্সিই লিখাচেভ। অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ভার্চুয়ালি যুক্ত থাকবেন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি।
প্রকল্প পরিচালক ড. শৌকত আকবর ও প্রকল্প সূত্র জানায়, প্রকল্পে কর্মরত রাশিয়ানসহ বিদেশি নাগরিকরা গ্রিনসিটি আবাসনে থাকেন। গ্রিনসিটির ভেতরে তাদের জন্য নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এই আয়োজন চলবে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত।
গ্রিনসিটির বিভিন্ন দেয়ালে শিল্পী টিপু সুলতানের চিত্রকর্ম পরিদর্শনকালে মঙ্গলবার (৩ অক্টোবর) বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান বলেন, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের জন্য এটিই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। বাংলাদেশ এখন বিশ্বে ৩৩তম পারমাণবিক দেশের মর্যাদা অর্জন করেছে। সেইসঙ্গে এই ধরনের টেকনোলজি নিয়ে কাজের সক্ষমতা অর্জন করেছি আমরা।
১ হাজার ৬২ একর জমির ওপর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটের নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে এটি চালু করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
২০২৪ সালের মার্চে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করার কথা রয়েছে। আর দ্বিতীয় ইউনিটেও ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সমপরিমাণ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রকল্পটির উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত হবে। এর ফলে দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি কমবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পার্বত্য চট্টগ্রাম সীমান্ত সড়ক :

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক ইচ্ছায় পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়নের অংশ হিসেবে তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান জেলায় সীমান্ত সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে শেষ হয়েছে প্রকল্পের ৯৫ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ কাজ। এ কারণে পাহাড়ি জনপদগুলোতে লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া।
পুরো সড়ক নির্মাণ শেষ হলে ভারত-বাংলাদেশের যোগাযোগের ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের যেমন প্রসার ঘটবে, তেমনি যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পর্যটন শিল্পের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটবে। পিছিয়ে পড়া এ অঞ্চলটি সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম দেশের এক গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। দুর্গম হওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামকে এক সময় পিছিয়ে পড়া অঞ্চল বলা হলেও বর্তমান সরকারের আমলে পার্বত্য চট্টগ্রামে নবযুগের সূচনা হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে সড়ক যোগাযোগে অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের দৃশ্যপট বদলে দিতে বর্তমান সরকার ২০১৯ সালে সীমান্ত সড়ক নির্মাণ কাজের সূচনা করে। সীমান্ত সড়ককে ঘিরে মানুষ এখন নতুনভাবে স্বপ্ন বুনছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, তথ্য প্রযুক্তি, পর্যটন শিল্পের প্রসার এবং জীবনমানের ব্যাপক পরিবর্তনে সীমান্ত সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়, সেনাবাহিনীর কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্সের ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের অধীনস্থ ১৬, ২০ এবং এডহক ২৬ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন সীমান্ত সড়ক নির্মাণ কাজ পরিচালনা করছে। সীমান্ত সড়কের মোট দৈর্ঘ্য ১০৩৬ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রথম পর্যায়ে একনেকে ৩১৭ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রকল্পটির প্রথম পর্যায়ের কাজের মধ্যে ৯৫ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এ বছর প্রকল্পটির আরও ১৩২ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। যা চলতি বছরের এপ্রিল মাসে শেষ হবে। অবশিষ্ট ৯০ কিলোমিটারের কাজ ২০২৪ সালের জুন মাসে সম্পন্ন হবে বলে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়।
সীমান্ত সড়ক নির্মাণের ফলে স্থানীয়রা যেমন আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠেছেন, তেমনি বর্তমান সরকারের এমন সাহসী উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন।
-পার্বত্য সময়

