২০১৭ সালে মিানমারের আরাকানে গণহত্যার শিকার হয়ে বাংলাদেশের কক্সবাজারে আশ্রয় নেয় বিপুল পরিমাণ রোহিঙ্গা শরণার্থী। গড়ে উঠে বেশ কিছু আশ্রয়শিবির। আগে থেকে ছিল আরও কিছু। সবমিলিয়ে এ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১২ লাখে। এরপরই এই বিশাল সংখ্যক মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে মাদকে সয়লাব হয়ে গেছে ক্যাম্পগুলো। আর মাদকের সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণেই গড়ে উঠেছে একের পর এক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। অর্ধযুগে ক্যাম্পগুলো পরিণত হয়েছে এসব গোষ্ঠীর আধিপত্যের যুদ্ধক্ষেত্রে। মাদক সাম্রাজ্য ধরে রাখতেই এ গোষ্ঠীগুলো রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হতে দিতে চায় না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কক্সবাজারের উখিয়ায় ২৭টি এবং নোয়াখালীর ভাসানচরের একটি আশ্রয়শিবিরে বর্তমানে ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীর বসবাস। এর মধ্যে উখিয়ার আশ্রয়শিবিরগুলো রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের আস্তানায় পরিণত হয়েছে। ক্যাম্পগুলোকে ঘিরে গড়ে উঠেছে চারটি সশস্ত্র সংগঠন। রয়েছে আরও ৭টি ডাকাতদল। এর মধ্যে সবচেয়ে সংগঠিত দলটি আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বা আরসা। ১৪ এপিবিএনের অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মো. ইকবাল বলেন, যখনই সন্ত্রাসীমূলক কর্মকান্ডের খবর পাচ্ছি, তখনই আমরা অভিযান চালাচ্ছি। কিন্তু সমস্যা হলো বেপরোয়া রোহিঙ্গারা মাদক ব্যবসার জন্য খুনোখুনির ঘটনা ছাড়ছে না। আধিপত্যের জন্যও তারা একে অপরকে হত্যা করছে। উখিয়া থানার ওসি শামীম হোসেন বলেন, রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয় মানুষের ঘুম হারাম। এখানকার সন্ত্রাসীরা ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠছে। তাদের কারণেই পরিবেশ অশান্ত হয়ে উঠছে।
সক্রিয় চার সশস্ত্র গোষ্ঠীঃ চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি যে প্রতিবেদন উপস্থাপন করে তাতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১০টি গোষ্ঠীর নাম উঠে আসে। তবে সম্প্রতি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চারটি সংগঠনের তৎপরতার বিস্তারিত। এই চারটি গোষ্ঠী এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্প অস্থির করে তুলছে। সংগঠনগুলো হচ্ছে: আরসা, আরএসও (রোহিঙ্গা সরিডারিটি অর্গানাইজেশন), এআরএ (আরাকান রোহিঙ্গা আর্মি) এবং ইসলামী মাহাজ। একইসঙ্গে গোষ্ঠীগুলে কে নির্মূলের সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনটিতে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে মোটাদাগে চারটি গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ও সুসংহত দল আরসা। এরপরেই অস্ত্রশস্ত্রের দিক দিয়ে সুসজ্জিত দলটি আরএসও। সম্প্রতি আরসা ও আরএসও'র মধ্যে সংঘাত ছড়িয়েছে ব্যাপক। এছাড়া সাবেক আরসা সদস্য নবী হোসেন মংডুতে বসেই গড়ে তুলেছেন আরাকান রোহিঙ্গা আর্মি (এআরএ) নামে একটি সশস্ত্র দল। মাদক সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণের দিক থেকে এটিই হয়তো বৃহৎ সশস্ত্র গোষ্ঠী। নবী হোসেনের গ্রুপের বেশিরভাগই আরসার সাবেক সদস্য। আবার আরএসও'র একটি অংশ নবী হোসেনের অনুগত। তবে আরেকটি গ্রুপ শিবিরগুলোতে সক্রিয় রয়েছে- যারা আরসার সক্রিয় সদস্য ছিল, কিন্তু সেখান থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। জানা গেছে, তারাও নবী হোসেনের আনুগত্য বজায় রেখেছে। এর বাইরে রয়েছে রোহিঙ্গা নেতা মুহিব্বুল্লাহর দল ইসলামী মাহাজ।
নেতৃত্ব দিচ্ছে যারাঃ রোহিঙ্গা ক্যাম্পের প্রায় সবগুলো গ্রুপেরই নাটাই চলে যাচ্ছে নবী হোসেনের হাতে। আরএসও, আরসা এবং আরসাত্যাগী দলটির অনেক কমান্ডারই নবী হোসেনের বেতনভুক্ত। কিন্তু নবী ক্যাম্পগুলোতে সরাসরি নেতৃত্বদানে অপারগ। তাই একটি কমিটি গঠন করে তার দলকে আরও সুসংহত করতে চায়। কমিটিতে রয়েছে মাস্টার আইয়ুব প্রকাশ নূর এবং মাস্টার ইউনুস। এর মধ্যে আইয়ুব পূর্বের রোহিঙ্গা। আর মাস্টার ইউনুস কক্সবাজারে এআরএ'র প্রেসিডিয়াম সদস্য ও উপদেষ্টা, সাবেক আরসা কমান্ডার মৌলভী ফজল করিমের ছোট ভাই। কমিটির দু'জনেই ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ প্রভৃতি মাদক চোরাচালন এবং সাধারণ রোহিঙ্গা অপহরণের সঙ্গে জড়িত। সূত্র বলছে, দু'জনেই বাংলাদেশি ডকুমেন্ট ব্যবহার করে ৩ থেকে ৪ বার বিদেশ সফর করেছে। তারা আরসাত্যাগী পক্ষটিকে ব্যবহার করে থাকে। আরসাত্যাগী গ্রুপে কমপক্ষে দেড়শ জনের সশস্ত্র বাহিনী রয়েছে। এ গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছে আব্দুল হালিম প্রকাশ কেফায়েতুল্লাহ (ক্যাম্প ৭), আমির রফিক প্রকাশ মাস্টার রফিক (ক্যাম্প-৭), মুক্তি আনাস (ক্যাম্প ১০), আবু সোয়াব প্রকাশ হামিদ হোছেন (ক্যাম্প ৯) এবং ফজল করিম (ক্যাম্প ১৮)। এদের সবার বিরুদ্ধেই ৫ থেকে ৬টি করে মামলা রয়েছে। সূত্র বলছে, আরসার বিরোধীরাও ইয়াবা সিন্ডিকেটের সাথে হাত মিলিয়ে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছে। একইভাবে আরএসও ক্যাম্পে শক্তিশালী অবস্থান করেই অপহরণ, ছিনতাইসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছে।
এরাও অন্যান্য দলের মতো ভয়ঙ্কর গেরিলায় রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। কারণ গোষ্ঠীটির যেমন লোকবল রয়েছে, তেমনি রয়েছে অস্ত্র-শস্ত্রও। ক্যাম্পগুলোতে আরএসও'র নেতৃত্ব দিচ্ছেন মৌলভী মোহাম্মদ নুর (ক্যাম্প-১১), নূর বশর (হেড মাঝি, ক্যাম্প-২ পশ্চিম), কামাল প্রকাশ মোস্তফা কামাল (২ পশ্চিম), সাদ্দাম (১ পশ্চিম), মো. আজিজ, মো. আলি, গান গ্রুপের কমান্ডার মো. ইউনুছ, সলিম প্রকাশ হাড়ি সেলিম (২ পশ্চিম) এবং রুহুল আমিন (ক্যাম্প-১ পশ্চিম)। এরা সবাই আরএসও থেকে ট্রেনিংপ্রাপ্ত। তবে সূত্র জানায়, তারা আরএসও'র নেতৃত্ব দিলেও কাজ করে নবী হোসেনর অধীনে। গোষ্ঠীটি সাধারণ রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নের সঙ্গে জড়িত। এছাড়া দিন দিন অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হচ্ছে তারা। এদের মূল গ্রুপ থাকে বান্দরবানের আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকায়। এছাড়া ঘুমধুম ও জিরো পয়েন্ট সীমান্তে দুই প্লাটুনের মতো অবস্থান করে।
-পার্বত্য সময়

