ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অন বাজেট অ্যান্ড পলিসি (সিবিপি) এর আয়োজনে গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের ভার্চুয়াল উপস্থিতিতে CBP পলিসি ডায়ালগ সিরিজ ২০২৪ এর দ্বিতীয় পর্ব অনুষ্ঠিত হলো। 'রোহিঙ্গা সংকটের নতুন মোড়: ভূরাজনীতি, মানবিক সহায়তা এবং প্রত্যাবাসন' শীর্ষক এ আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তারা আরাকান আর্মি ও ন্যাশনাল ইউনাইটেড গভর্মেন্ট (এনইউজি) রোহিঙ্গাদের নিয়ে সম্প্রতি যে মন্তব্য করেছেন তাতে সন্তুষ্টি জানালেও পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারছেন না। বিশেষজ্ঞ এ আলোচকরা বিষয়টি সময় নিয়ে আরও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার পরামর্শ দিয়েছেন।
সিবিপি'র পূর্বঘোষিত সময় অনুযায়ী ২৫ মার্চ (সোমবার) বাংলাদেশ সময় রাত ১০ টা থেকে শুরু হয় এ আলোচনা অনুষ্ঠান। দেশ ও দেশের বাইরের নেটিজেনরাও আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।
আলোচনা অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মারুফুল ইসলাম সঞ্চালনার ভূমিকা পালন করেন। অনুষ্ঠানে আলোচকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. নাসির উদ্দীন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. নিলয় রঞ্জন বিশ্বাস ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আই এর জ্যেষ্ঠ বার্তা সম্পাদক মীর মাসরুর জামান।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই সঞ্চালক অধ্যাপক ড. কাজী মারুফুল ইসলাম রোহিঙ্গা বিষয়ক বর্তমান পটভূমি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মায়ানমারের বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণের পর থেকে লম্বা একটা সময় কেটে গেছে। রোহিঙ্গা শিবিরে জনমিতির অবশ্যম্ভাবী একটি পরিবর্তন লক্ষ্যণীয়। এছাড়া মিয়ানমারের চলমান সংঘাতে ওই দেশের রাজনৈতিক একটি পরিবর্তন এনেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে অন্যান্য অনুষঙ্গ হিসেবে আন্তর্জাতিক ও ইন্দোপ্যাসিফিক অঞ্চলের শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্ধিতা ও রাজনৈতিক অবস্থানের বিষয় তুলে ধরে বাংলাদেশের করণীয় বিষয়গুলো জানতে চান।
অধ্যাপক ড. নাসির উদ্দীন তার আলোচনায় মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতকে 'সিভিল ওয়ার' হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি মনে করেন, কলোনাইজেশন পরবর্তী সময় থেকে মিয়ানমারে যতবার সেনাশাসক ক্ষমতা দখল করেছে, তারমধ্যে সবচেয়ে ভিন্নতর হচ্ছে সর্বশেষ ক্ষমতা দখলের প্রক্রিয়া। বিশ্ববাসী যখন মিয়ানমারে স্থায়ী গণতন্ত্রের জন্য আশাবাদ ব্যক্ত করে, সেই সময়েই জান্তা ক্ষমতা দখল করে। এই পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের সাধারণ জনগণের মধ্যেও জান্তা-বিরোধী মনোভাব জাগ্রত হয়।
নাসির উদ্দীন বলেন, ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্মেন্টের (এনইউজি) পিপলস ডিফেন্স ফোর্স ছাড়াও মিয়ানমারের আঞ্চলিক শক্তিগুলোর একটি জোট থ্রি ব্রাদারহুড এলায়েন্স এর সংঘবদ্ধ আক্রমণে দেশটির কেন্দ্রীয় বাহিনী অনেকটা কোণঠাসা অবস্থায়। তিনি সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে দেশটির অন্তত ১০০টি টাউনশিপ দখলের কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, আরাকান আর্মি বাংলাদেশ ঘেষা রাখাইন রাজ্যের ৮ টি টাউনশিপসহ প্রায় ৭০ শতাংশ দখলে নিয়েছে।
তবে আরাকান আর্মি রাখাইন দখল করলেও তিনি দ্রুত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন না বলে জানান। তিনি ইয়াঙ্গুন দখলের ব্যাপারে এই প্রতিরোধকারী গোষ্ঠীগুলোর সক্ষমতা নিয়ে কিছুটা সন্দেহ পোষণ করেন। একইসাথে নৃবিজ্ঞানের এ অধ্যাপক মনে করেন, রোহিঙ্গাদের বিষয়ে প্রবাসী সরকার (এনইউজি) ও আরাকান আর্মির একটি সহমর্মিতা আছে। কিন্তু এ সহমর্মিতার বহিঃপ্রকাশ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর উপায় হিসেবেও তারা গ্রহণ করতে পারে বলে তিনি ধারনা দেন।
তিনি নিজের মাঠ পর্যায়ে গবেষণার কথা উল্লেখ করে বলেন, রোহিঙ্গারা দেশে ফেরত যেতে চাইলেও কিছু প্রশ্নের উত্তর তারা চায়। যেমন- তাদের নাগরিকত্ব, জীবনের নিরাপত্তা, ফেলে আসা জমি তাদের ফেরত দেওয়া হবে কি না? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর বাংলাদেশের কাছে নেই।
তাছাড়া তিনি মনে করেন, মিয়ানমারে পরবর্তী কোনো গণতান্ত্রিক সরকার গঠন হলেও সেনাবাহিনীর আধিপত্য থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে এবং সেক্ষেত্রে রোহিঙ্গা প্রত্যবাসন সহজতর হচ্ছে না।
সঞ্চালক অধ্যাপক ড. কাজী মারুফুল ইসলামও এ বিষয়ে একমত পোষণ করে বলেন, আমিও যতদূর জানি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে দায়িত্বশীল যারা আছেন তারাও মনে করছেন না খুব সহসাই এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
কাজী মারুফুল উল্লেখ করেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কেবল মিয়ানমারের ইচ্ছের ওপরই পুরোপুরি নির্ভর করছে না। বরং আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর স্বার্থও এর সাথে জড়িত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. নিলয় রঞ্জন বিশ্বাস বক্তব্যের শুরুতেই মিয়ানমারকে 'ক্রিটিক্যাল জিও পলিটিক্যাল হটস্পট' হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি মিয়ানমারে চীন, জাপান ও ইন্ডিয়ার পাশাপাশি পশ্চিমা বিশ্বের ইনভেস্টমেন্টের উল্লেখ করে বলেন, এ কারণেই হয়তো সেখানে প্রত্যাশিত ইনোকোনোমিক্যাল স্যাংসন আসেনি এবং তাদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক তারা চলমান রেখেছে। আর এ কারণেই মিয়ানমারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের পরও বিচার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অনেকের ধারণা বলে মনে করেন তিনি।
১৯৮২ সালের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইনের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে বেশ কিছু জাতিগোষ্ঠী বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের 'নন-সিটিজেন' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তবে মিয়ানমারের প্রবাসী সরকার (এনইউজি) ও আরাকান আর্মির বর্তমান বক্তব্যে তিনি কিছুটা আশাবাদী। এনইউজে সংবিধান পরিবর্তন করার একটা আভাস দিলেও মিয়ানমারে আমূল পরিবর্তন আনার ব্যাপারে এ আলোচক কিছুটা সন্দেহ পোষণ করেন।
তিনি বলেন, জান্তা বিরোধী মিয়ানমারের বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মূল চাওয়াগুলো এখনও অস্পষ্ট। বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সম্ভাব্য চাহিদা যেমন- আঞ্চলিক স্বাধীনতা অথবা গণতান্ত্রিক মায়ানমারের পুনরুত্থান কিংবা ফেডারেশন সরকার হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। এক্ষেত্রে তিনি চিনের মধ্যস্থতায় থ্রি ব্রাদারহুডের একাংশের আলোচনার বিষয় উল্লেখ করেন। সেখানে জান্তার সাথে রেভিনিউ শেয়ারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি জানান।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ের এ শিক্ষক বলেন, বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমরা নিরাপদ প্রত্যাবসান চাচ্ছি। মিয়ানমার রাষ্ট্রের প্রকৃতি পরিবর্তন করে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নির্ভর করবে মায়ানমারের ইনভেস্টর ও নীতি নির্ধারকদের গৃহীত ভূমিকার ওপর।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে তিনি মিয়ানমারের ফান্ডামেন্টাল (মৌলিক) পরিবর্তনের বিষয়েই গুরুত্বরোপ করেন।
সাংবাদিক মীর মাসরুর জামান বলেন, রোহিঙ্গাদের মানবিক দিক নিয়ে বলতে গেলে প্রথমে বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দেয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদের প্রত্যাবাসনে ভূমিকা রাখার কথা বললেও এখন এটা প্রশ্নবিদ্ধ। আর সাহায্য সেটা যৎসামান্য! রোহিঙ্গা শিশুদের খাবার শরনার্থী শিবিরের আশেপাশে গো-খাদ্য হিসেবে বিক্রি হচ্ছে। এসব দিক বিবেচনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আরও প্রশ্নের সম্মুখীন হবে।
তিনি কড়া ভাষায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সমালোচনা করে বলেন, পুরো বিশ্বই চলছে- জোর যার মুল্লুক তার নীতিতে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক মোড়লদের কথাই কাজে দেবে বলে তিনি মনে করেন।
উল্লেখ্য এর আগে ২০ মার্চ (সোমবার) 'রোহিঙ্গা সংকটে নতুন মোড়: সমসাময়িক ঘটনা ও পরিণতি' শীর্ষক CBP পলিসি ডায়ালগ সিরিজ -২০২৪ এর প্রথম অংশ অনুষ্ঠিত হয়। অধ্যাপক ড. কাজী মারুফুল ইসলাম উপস্থাপনায় আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজের অধ্যাপক ড. রফিক শাহরিয়ার, বাংলাদেশ সরকারের থিংক ট্যাংক খ্যাত বাংলাদেশ ইনিস্টিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) এর গবেষণা পরিচালক এএসএম ইউসুফ এবং বেসরকারি সংবাদমাধ্যম যমুনা টেলিভিশনের বিশেষ সংবাদদাতা মাহফুজুর রহমান মিশু।
অনুষ্ঠানে বক্তারা গবেষণা, তথ্য-উপাত্ত, অনুমান ও বাস্তবতার নিরিখে এ সংকট থেকে সম্ভাব্য সমাধান বিষয়ে তাদের নিজস্ব মতামত তুলে ধরেন। আলোচকরা একটি বিষয়ে সহমত পোষণ করেন যে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চলমান সংঘাত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করেছে। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কার্যকরী ব্যবস্থাগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে তারা বাংলাদেশ সরকারকে কৌশলী ভূমিকা পালনের পরামর্শ দেন।
-পার্বত্য সময়

