বিশ্বজুড়ে যখন অন্যায়, মানবাধিকার লঙ্ঘন আর আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অবজ্ঞার চিত্র নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, ঠিক তখনই ২০২৬ সালের শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিশ্ববাসীকে এক নতুন বার্তার মুখোমুখি করেছে। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার রক্ষায় অসামান্য অবদানের জন্য নরওয়ের নোবেল কমিটি ৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রখ্যাত আইনজীবী নাভানেথেম নাভি পিল্লির শান্তিতে নোবেল পাওয়ার ঘোষণা দেয়।
বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার হিসেবে তার দীর্ঘ চার দশকের গৌরবোজ্জ্বল লড়াইয়েরই বৈশ্বিক স্বীকৃতি এই সম্মাননা। তবে এই বৈশ্বিক স্বীকৃতির পর পিল্লির ওপর এখন এক নতুন এবং সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রত্যাশার চাপ তৈরি হয়েছে-যা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) চলমান রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার বিচারিক প্রক্রিয়াকে এবং বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগকে এক নতুন গতি দিতে পারে।
পিল্লাই মূলত আইসিজে-তে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার দায়ের করা ঐতিহাসিক রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার একজন অ্যাডহক বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর মায়ানমার সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত নৃশংসতাকে ‘গণহত্যা’ আখ্যা দিয়ে যে আইনি লড়াই শুরু হয়েছিল, পিল্লি সেই বিচারিক প্যানেলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রূপকার। ফলে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ের পর পিল্লির আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও বিচারিক অবস্থানের ওপর বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের নজর এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি প্রবল। এই বিশ্বমানের স্বীকৃতি তার ওপর একটি অভূতপূর্ব নৈতিক ও আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা তৈরি করেছে, যা আইসিজে-র এজলাসে রোহিঙ্গা সংকটের সুষ্ঠু ও নিবিড় বিচারে পিল্লাইয়ের ভূমিকাকে আরও বেশি কার্যকর ও জোরালো করতে বাধ্য করবে।
২০১৭ সালে মায়ানমার সামরিক বাহিনীর নির্মম অভিযানের পর হত্যা, নির্যাতন, যৌন সহিংসতা ও ঘরবাড়ি ধ্বংসের মুখে লাখ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। দীর্ঘ দিন ধরে বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার অবস্থান মানবিক সংকটকে প্রতিনিয়ত আরও জটিল করে তুলছে- আন্তর্জাতিক সহায়তা দিন দিন কমছে, ক্যাম্পগুলোতে নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার অবনতি ঘটছে। এমন এক কঠিন মুহূর্তে আইসিজে-তে চলমান মামলাটিই হয়ে উঠেছে রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার পাওয়ার অন্যতম প্রধান বৈশ্বিক পথ।
নাভি পিল্লির নোবেল জয় আইনি প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ফলাফল এক রাতে নির্ধারণ করে দেবে-এমনটি ভাবার সুযোগ নেই। আদালতের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করবে আইনি প্রক্রিয়া, উপস্থাপিত প্রমাণ ও আন্তর্জাতিক আইনের ওপর। তবে একজন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকারকর্মী ও বিচারকের নোবেল লাভ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আড়ালে চলে যাওয়া এই সংকটটির দিকে বিশ্ববাসীর মনোযোগ ধরে রাখার একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে। কারণ, আন্তর্জাতিক মনোযোগ কমে গেলে অনেক বড় বড় শরণার্থী সংকটও বৈশ্বিক অগ্রাধিকার তালিকা থেকে পিছিয়ে পড়ে।
পিল্লির ওপর তৈরি হওয়া এই বৈশ্বিক প্রত্যাশা তাই মাতৃভূমিহারা রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার এক বিরল সম্ভাবনা তৈরি করেছে। আইসিজে-র বিচারিক প্যানেলে একজন নোবেলজয়ী আইনি ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি মামলাটির গুরুত্বকে বিশ্বমঞ্চে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে শুধু আইনি প্রক্রিয়াই যথেষ্ট নয়; আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রক্রিয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন সুদৃঢ় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উদ্যোগ।
সবচেয়ে বড় কথা, রোহিঙ্গাদের জন্য বিচার মানে শুধু আদালতের রায় বা অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া নয়। বিচার মানে হলো তাদের নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা, মানবেতর জীবনের অবসান এবং নিজ ভূমে সম্মানজনক প্রত্যাবাসন নিশ্চিত হওয়া। তাই কেবল পদকের আলো বা বিশ্বমঞ্চের উদযাপনে বাস্তুচ্যুত মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে না। পিল্লির নোবেল সম্মাননা তখনই অর্থবহ হয়ে উঠবে, যখন বিশ্বনেতারা এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আইসিজে-র গণহত্যা মামলার বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করবেন এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পথ সুগম করবেন। পিল্লির এই বৈশ্বিক অর্জনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়া আন্তর্জাতিক চাপ যেন রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফেরার এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার পথকে চূড়ান্তভাবে সুগম করে-আজকের দিনে সেটাই মূল প্রত্যাশা।
লেখক- মানবাধিকার কর্মী ও অনলাইন এক্টিভিস্ট


