পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার তিনটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে। নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদ মোকাবিলা, সীমান্ত সুরক্ষা, উন্নয়ন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, আইন ও নীতিগত সংস্কার- বহুমাত্রিক এসব বিষয়কে একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশলের আওতায় আনার উদ্যোগ হিসেবেই এই কাঠামোকে দেখা যায়।

ক্যাবিনেট বিভাগের পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় কমিটি’, ‘কার্যনির্বাহী কমিটি’ এবং ‘পরামর্শক কমিটি’। তিনটি কমিটির দায়িত্বও আলাদা। একটি জাতীয় পর্যায়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, একটি জাতীয় কৌশলের খসড়া প্রণয়ন করবে এবং অন্যটি মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মতামতের ভিত্তিতে সুপারিশ দেবে।

এই কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত এখানেই- পার্বত্য চট্টগ্রামকে শুধু আইনশৃঙ্খলা বা নিরাপত্তার সমস্যা হিসেবে না দেখে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতাকে একই নীতিগত কাঠামোর মধ্যে বিবেচনার চেষ্টা করা হয়েছে।

তিন কমিটির মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে জাতীয় কমিটি। প্রধানমন্ত্রী এই কমিটির সভাপতি। এতে অর্থ ও পরিকল্পনা, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, ভূমি, আইন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং তিন পার্বত্য জেলার নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

জাতীয় কমিটির দায়িত্ব শুধু কোনো নির্দিষ্ট সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করা, নিরাপত্তা বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর কার্যপরিধি নির্ধারণ এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয় কৌশল চূড়ান্ত করার দায়িত্বও এই কমিটির ওপর দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, কার্যনির্বাহী কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন স্বরাষ্ট্র সচিব। তিন মাসের মধ্যে পরামর্শক কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে জাতীয় কৌশলের খসড়া তৈরি করা এই কমিটির অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

তবে এই কমিটির কাজকে শুধু নিরাপত্তাকেন্দ্রিক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সন্ত্রাসবাদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদ মোকাবিলার পাশাপাশি সীমান্ত নিরাপত্তা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং পার্বত্য অঞ্চলের সব জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের বিষয়ও এর দায়িত্বের মধ্যে রাখা হয়েছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো- বিদ্যমান আইন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বিভিন্ন বিধান এবং সংশ্লিষ্ট বিধি ও প্রবিধান পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংস্কার কিংবা নতুন আইন ও বিধিমালা প্রণয়নের সুপারিশ করার দায়িত্বও কার্যনির্বাহী কমিটিকে দেওয়া হয়েছে।

তৃতীয় স্তরে রয়েছে পরামর্শক কমিটি। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটির চেয়ারম্যান এই কমিটির সভাপতি। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, আঞ্চলিক পরিষদ এবং তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রতিনিধিরাও এতে রয়েছেন।

বিশেষ করে বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের অন্তর্ভুক্তি গুরুত্বপূর্ণ। তারা নিজ নিজ জেলার স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং পাহাড়ের অবাঙালি জনগোষ্ঠীর গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিত্বশীল কণ্ঠ। ফলে জাতীয় পর্যায়ে প্রণীত একটি কৌশল তৈরির প্রক্রিয়ায় পাহাড়ের স্থানীয় ও জনগোষ্ঠীভিত্তিক বাস্তবতার প্রতিফলনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা ঢাকায় বসে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। ভূমি, যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, সীমান্ত, পরিচয় এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব- প্রতিটি প্রশ্নের সঙ্গে স্থানীয় বাস্তবতা জড়িত। তাই স্থানীয় পর্যায়ের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ কেবল আনুষ্ঠানিক বিষয় নয়; কার্যকর নীতি প্রণয়নের জন্য এটি প্রয়োজনীয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের সংকটের একটি বড় শিক্ষা হলো- শুধু নিরাপত্তা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা কঠিন। নিরাপত্তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা, সীমান্তবর্তী অপরাধ, অস্ত্র ও মাদক পাচার, চাঁদাবাজি কিংবা সহিংসতা- এসব মোকাবিলায় রাষ্ট্রের কার্যকর সক্ষমতা থাকা জরুরি। একই সঙ্গে পাহাড়ের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।

কিন্তু নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রয়োজন উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, কার্যকর প্রশাসন, আইনের শাসন, সামাজিক আস্থা এবং জনগণের অংশগ্রহণ। এই জায়গাতেই নতুন কমিটিগুলোর কাঠামো তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ একই কৌশলের মধ্যে নিরাপত্তা, উন্নয়ন, সামাজিক সম্প্রীতি, সীমান্ত সুরক্ষা এবং আইন সংস্কারের বিষয়গুলোকে আনার চেষ্টা করা হয়েছে।

অর্থাৎ, পাহাড়কে শুধু ‘নিরাপত্তা সমস্যা’ হিসেবে না দেখে একটি জটিল সামাজিক-রাজনৈতিক ও উন্নয়ন বাস্তবতা হিসেবে দেখার একটি প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ এখানে লক্ষ্য করা যায়।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি এই অঞ্চলের রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে জাতীয় কৌশল প্রণয়নের সময় চুক্তির বিভিন্ন বিধান পর্যালোচনার সিদ্ধান্তও তাৎপর্যপূর্ণ।

এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। প্রথমত, চুক্তির যেসব বিষয় বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত, সেগুলোর বর্তমান অবস্থা ও বাস্তব প্রতিবন্ধকতা কী- তা মূল্যায়ন করা। দ্বিতীয়ত, বর্তমান নিরাপত্তা, প্রশাসনিক ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে বিদ্যমান আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটি পর্যালোচনা করা।

আইন সংশোধনের সুপারিশের অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে চুক্তির কোনো নির্দিষ্ট বিধান পরিবর্তন করা নয়। বরং সংশ্লিষ্ট আইন, বিধি এবং চুক্তির বিধানগুলো বাস্তবে কীভাবে কাজ করছে, কোথায় অসঙ্গতি বা ঘাটতি রয়েছে এবং কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন- সেটি তথ্য ও আলোচনার ভিত্তিতে নির্ধারণ করাই হবে গুরুত্বপূর্ণ।

পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিচালনা ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বহু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করে। ভূমি মন্ত্রণালয়, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ, বিজিবি, সশস্ত্র বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব এখানে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।

কিন্তু একাধিক প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি সবসময় সমন্বিত নীতি নিশ্চিত করে না। বরং দায়িত্বের বিভাজন কখনো কখনো নীতিগত অসংগতি তৈরি করতে পারে।

নতুন তিন স্তরের কাঠামো সেই জায়গায় একটি সমন্বিত ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করছে। জাতীয় কমিটিতে রাজনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতৃত্ব, কার্যনির্বাহী কমিটিতে প্রশাসন ও নিরাপত্তা কাঠামোর সমন্বয় এবং পরামর্শক কমিটিতে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ- তিনটি স্তরকে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ দিচ্ছে।

প্রয়োজনে সশস্ত্র বাহিনী, নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা অন্যান্য বিশেষজ্ঞকেও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কমিটিতে যুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ মতামত নেওয়ার পথও খোলা থাকছে।

এই উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সময়সীমা নির্ধারণ। পরামর্শক কমিটিকে দুই মাসের মধ্যে সুপারিশ দিতে হবে। এরপর সেই সুপারিশের ভিত্তিতে কার্যনির্বাহী কমিটি তিন মাসের মধ্যে জাতীয় কৌশলের খসড়া তৈরি করবে। তারপর তা জাতীয় কমিটির কাছে যাবে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য।

অর্থাৎ কাঠামোটি মূলত তিন ধাপে সাজানো- পরামর্শ, কৌশল প্রণয়ন এবং জাতীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত। কিন্তু কোনো কমিটি গঠনই নিজে থেকে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে না। একটি প্রজ্ঞাপন, একটি নীতিমালা কিংবা একটি কৌশলপত্র পাহাড়ের বহু দশকের সমস্যা রাতারাতি সমাধান করতে পারে না।

চ্যালেঞ্জ হবে আরও কঠিন জায়গায়- সুপারিশ বাস্তবায়নে। কৌশলটি কতটা তথ্যনির্ভর হবে? স্থানীয় মানুষের মতামত কতটা গুরুত্ব পাবে? নিরাপত্তা ও উন্নয়নের মধ্যে কী ধরনের ভারসাম্য তৈরি হবে? ভূমি বিরোধের মতো দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সমাধানে কতটা বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া হবে? চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে মতপার্থক্যগুলো কীভাবে মোকাবিলা করা হবে? এবং সর্বোপরি, পাহাড়ের সাধারণ মানুষের মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কীভাবে আরও শক্তিশালী করা হবে? এসব প্রশ্নের উত্তরই শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ধারণ করবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রতিশ্রুতি, চুক্তি, নীতি ও উদ্যোগ দেখেছে। এবার প্রয়োজন এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে সিদ্ধান্ত হবে বাস্তবতার ভিত্তিতে, মতামত নেওয়া হবে সংশ্লিষ্ট মানুষের কাছ থেকে এবং ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবায়নেরও সুস্পষ্ট যোগ থাকবে।

লেখক- সাংবাদিক ও কলামিস্ট