আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার চেষ্টা করছে মিয়ানমারের সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মি। তবে একই সময়ে রোহিঙ্গাদের নিজস্ব পরিচয়কে অস্বীকার করছে বলে অভিযোগ করেছেন রোহিঙ্গা সংকট গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আরসিআরআই) নির্বাহী পরিচালক মিসবাহ মুশারফ।
মিয়ানমারের মিজজিমা পত্রিকায় প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ২৬ মার্চ আরাকান আর্মির প্রধান তুয়ান ম্রাত নাইং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার এই মন্তব্যকে তিনি শুধু ভাষাগত বিষয় নয়, বরং একটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন।
নিবন্ধে বলা হয়, মিয়ানমারে দীর্ঘদিন ধরে ‘বাঙালি’ শব্দটি রোহিঙ্গাদের বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করতে ব্যবহার করেছে দেশটির সামরিক বাহিনী ও রোহিঙ্গাবিরোধী জাতীয়তাবাদীরা। এর মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, ইতিহাস ও রাখাইনে তাদের অবস্থান অস্বীকারের চেষ্টা করা হয়েছে।
মিসবাহ মুশারফের দাবি, রোহিঙ্গারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম নিজেদের এই নামেই পরিচয় দিয়ে আসছে। তাদের পরিচয় স্বীকৃতির বিষয়টি মৌলিক অধিকার। আরাকান আর্মি রাখাইন জনগোষ্ঠীর পরিচয় ও অধিকারের স্বীকৃতি চাইলে রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা উচিত বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নিবন্ধে বলা হয়, আরাকান আর্মি ও তাদের রাজনৈতিক শাখা ইউনাইটেড লীগ অব আরাকান (ইউএলএ) রাখাইন রাজ্যে নিজেদের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, বিদেশি বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতা প্রত্যাশা করছে। তবে নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় বসবাসরত রোহিঙ্গাদের অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে তাদের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
মিসবাহ মুশারফ বলেন, কয়েকটি মসজিদ পুনরায় চালু করা বা কিছু মুসলিম প্রতিনিধিকে সামনে আনা প্রকৃত সমতার প্রমাণ নয়। প্রকৃত স্বীকৃতির অর্থ হলো—রোহিঙ্গা পরিচয় মেনে নেওয়া, চলাচলের স্বাধীনতা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, সম্পত্তির অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
নিবন্ধে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদনের উল্লেখ করে বলা হয়, আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণাধীন কিছু এলাকায় রোহিঙ্গাদের চলাচলে বাধা, নির্বিচারে আটক, জোরপূর্বক শ্রম, নিয়োগ এবং সম্পত্তি দখলের অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া ২০২৪ সালের ২ মে হোয়্যার সিরি গ্রামে রোহিঙ্গাদের হত্যার অভিযোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এ ঘটনায় আরাকান আর্মির সদস্যদের জড়িত থাকার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়। তবে আরাকান আর্মি এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
নিবন্ধে বলা হয়, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে স্বাধীন তদন্তের সুযোগ দেওয়া, নিখোঁজ ও আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য প্রকাশ এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন।
মিসবাহ মুশারফ আরও বলেন, কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী সামরিকভাবে শক্তিশালী হলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ন্যায়ভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয় না। একটি জনগোষ্ঠীর স্বাধীনতা অন্য আরেকটি জনগোষ্ঠীর অধিকার ও পরিচয় অস্বীকারের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।
তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আরাকান আর্মির সঙ্গে যেকোনো যোগাযোগের ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের পরিচয়ের স্বীকৃতি, চলাচলের স্বাধীনতা, সম্পত্তির সুরক্ষা, মানবিক সহায়তার সুযোগ এবং অভিযোগের স্বাধীন তদন্তের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
নিবন্ধের শেষে তিনি বলেন, আরাকান আর্মি যদি আন্তর্জাতিক বৈধতা চায়, তবে তাদের রোহিঙ্গাদের সমান জনগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। শুধু নতুন পতাকা বা নতুন রাজনৈতিক পরিচয় পুরোনো বৈষম্যমূলক নীতিকে পরিবর্তন করতে পারে না।


