রোহিঙ্গা গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় এবং গণহত্যার স্মৃতি ও প্রমাণ সংরক্ষণে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একটি ‘রোহিঙ্গা গণহত্যা সেল’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনীতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) কক্সবাজারে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ‘গণহত্যা কূটনীতি ও রোহিঙ্গা: বিচার, স্বীকৃতি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার রাজনীতি’ শীর্ষক গবেষণা-নীতি সংলাপে তিনি এ প্রস্তাব দেন।
রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেশন ল্যাব (আরএমএল) আয়োজিত এ সংলাপে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ওয়েলস সহযোগিতা করে। এতে অর্থায়ন করে ব্রিটিশ একাডেমি।
অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, অন্যান্য গণহত্যার ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠী নিজেদের অভিজ্ঞতা ও ইতিহাস সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রেও এ দায়িত্ব নিজেদের নিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘ক্যাম্পের ভেতরেই একটি রোহিঙ্গা গণহত্যা সেল গঠন করা যেতে পারে।’
তার প্রস্তাব অনুযায়ী, এ সেলের সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা রোহিঙ্গা প্রবাসীদের যুক্ত করা যেতে পারে। গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, নথি ও অন্যান্য প্রমাণ সংগ্রহ করে একটি আর্কাইভ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব তথ্য দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করা সম্ভব বলেও উল্লেখ করেন অধ্যাপক ইমতিয়াজ।
গণহত্যা নিয়ে গবেষণার উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মানুষকে আরও সংবেদনশীল ও সচেতন করে তোলা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা পুনরায় না ঘটে। তবে বিশ্বে একের পর এক গণহত্যা সংঘটিত হওয়ায় এ ধরনের উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়েও নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু মানবিক সংকট হিসেবে দেখার ঝুঁকি রয়েছে। খাবার, পানি, আশ্রয়, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মতো জরুরি প্রয়োজনের আলোচনায় বাস্তুচ্যুতির রাজনৈতিক কারণ আড়ালে পড়ে যেতে পারে। রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তার পাশাপাশি তাদের রাজনৈতিক অধিকার ও মর্যাদার বিষয়টিও আলোচনায় রাখা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এএসএম রিদওয়ানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গাদের পরিচয় সংকট প্রত্যাবাসন আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি ট্র্যাক-১, ট্র্যাক-২ ও ট্র্যাক-১.৫ কূটনীতির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের পরিচয় ও নাগরিক অধিকারের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ের অতিরিক্ত কমিশনার নাজমুল ইসলাম ভুঁইয়া বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রধান বাধাগুলো চিহ্নিত করতে গবেষকদের আরও কাজ করা প্রয়োজন। সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘ, আসিয়ান, ওআইসি ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার ভূমিকা এবং সীমাবদ্ধতাও গবেষণায় তুলে আনার আহ্বান জানান তিনি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিয়ানমার অনুবিভাগের পরিচালক নির্ঝর অধিকারী বলেন, ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বর্তমান সংকট সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। গবেষকদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত তথ্য ও বিশ্লেষণ পাওয়া গেলে প্রত্যাবাসনের জন্য ইতোমধ্যে বিবেচিত পাঁচটি পথের পাশাপাশি নতুন পথও তৈরি করা সম্ভব বলে তিনি জানান।
সংলাপে অধ্যাপক নাসির উদ্দিন, ড. পলাশ কামরুজ্জামান ও ড. বায়েস আহমেদ সম্পাদিত ‘পলিটিক্স অব ডিনায়াল অ্যান্ড নন-রিকগনিশন অব জেনোসাইড: দ্য কেস অব দ্য রোহিঙ্গা’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
রোহিঙ্গা প্রতিনিধি আনামুল হাসান নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ‘গণহত্যা শুধু বইয়ের বিষয় নয়, এটি রোহিঙ্গাদের স্মৃতি এবং হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।’


