কক্সবাজার-টেকনাফ উপকূল থেকে অবৈধ নৌপথে মালয়েশিয়াগামী ট্রলারডুবির ঘটনায় বেঁচে ফেরা ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে একটি সুসংগঠিত ও বহুস্তরবিশিষ্ট মানবপাচার চক্রের চিত্র উঠে এসেছে। অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে, এই চক্রের বিস্তার রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে শুরু করে উপকূলীয় এলাকা পর্যন্ত, যেখানে স্থানীয় দালাল, ট্রলারচালক, অর্থসংগ্রাহক এবং নিয়ন্ত্রণকারীরা সমন্বিতভাবে কাজ করে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যানুসারে, উদ্ধার হওয়া নয়জনের মধ্যে ছয় বাংলাদেশিকে পাচারচক্রের সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্যদিকে ভুক্তভোগী রোহিঙ্গাদের বয়ানে উঠে এসেছে চক্রটির অভ্যন্তরীণ কাঠামো- যেখানে বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত থেকে প্রত্যেকে নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করে।

ট্রলারডুবির ঘটনায় অন্তত ২৫০ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। তবে তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক তালিকা এখনো প্রশাসনের কাছে নেই, এমনকি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পক্ষ থেকেও মামলা দায়ের করা হয়নি- যা তদন্তকে আরও জটিল করে তুলেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকা থেকে দালালদের মাধ্যমে যাত্রী সংগ্রহ করে তাদের ট্রলারে তোলা হয়। এই প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিত্তিক দালালদের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। তারা কাজ বা উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে শরণার্থীদের এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় রাজি করায়।

বেঁচে ফেরা এক রোহিঙ্গা, কুতুপালং ক্যাম্পের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম জানান, ‘মাহ নূর’ নামের এক দালাল তাকে টেকনাফ বন্দরে কাজ দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ট্রলারে তোলে। পরে তার পরিবারের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা আদায় করা হয়। ট্রলারডুবির পর ওই দালাল গা-ঢাকা দেয়।

একইভাবে স্থানীয় গ্রামভিত্তিক দালালদের মাধ্যমেও লোকজন সংগ্রহ করা হয়। রামুর কচ্ছপিয়া দক্ষিণ পাড়া থেকে একসঙ্গে নিখোঁজ চার যুবকের ঘটনায় পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় এক ব্যক্তি তাদের মালয়েশিয়া পাঠানোর নামে নিয়ে যান। নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রথমে কম টাকার প্রলোভন দেখিয়ে পরে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়।

ভুক্তভোগীদের বয়ানে উঠে এসেছে ট্রলারের ভেতরের ভয়াবহ চিত্রও। তাদের মতে, ট্রলারের মাঝি, ইঞ্জিনচালক এবং দালাল—সবাই একই চক্রের অংশ। যাত্রীদের ওপর নির্যাতন চালানো, খাবার ও পানি না দেওয়া এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায় ছিল নিয়মিত ঘটনা।

আরেক ভুক্তভোগী জানান, ট্রলারে থাকা দালালরা যাত্রীদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালাত। পানি চাইলে মারধর করা হতো, এমনকি লাথি মেরে ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই চক্রে জড়িতদের মধ্যে অনেকেই পূর্বে একাধিকবার একই পথে যাতায়াত করেছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ প্রথমে ‘যাত্রী’ হিসেবে গেলেও পরে ‘বিশ্বাসযোগ্য’ ব্যক্তি হিসেবে দালাল বা রিক্রুটারে পরিণত হয়। এতে করে নতুন যাত্রী সংগ্রহ সহজ হয় এবং চক্রটি আরও বিস্তৃত হয়।

তবে সব অভিযুক্তই যে চক্রের সক্রিয় সদস্য, এমনটি নিশ্চিত নয়। কিছু ক্ষেত্রে প্রতারণার শিকার হয়েও অনেকে এই যাত্রায় যুক্ত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে ‘মাঝি’ ও ‘মাস্টারমাইন্ড’—এই দুইয়ের পার্থক্য নির্ধারণ করাও তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে।

মানবিক দিক থেকেও এই চিত্র অত্যন্ত করুণ। এক নারী ভুক্তভোগীর পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, পারিবারিক নির্যাতন ও সামাজিক চাপের কারণে তিনি এই যাত্রায় বের হন। উন্নত জীবনের আশায় তাকে মালয়েশিয়া নেওয়ার প্রলোভন দেখানো হয়েছিল।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিখোঁজদের কোনো নির্দিষ্ট তালিকা এখনো পাওয়া যায়নি। আ. মান্নান জানান, প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে এবং জড়িতদের শনাক্তে কাজ চলছে।

এদিকে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড ইতোমধ্যে ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। টেকনাফ থানা পুলিশ জানিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং রিমান্ড চাওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোহিঙ্গাদের মধ্যে ‘স্বেচ্ছা পাচার’ প্রবণতা বাড়ছে, যা আসলে হতাশা ও অনিশ্চয়তার সুযোগ নিচ্ছে এই চক্র। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, “রাষ্ট্রহীনতা, সীমিত সুযোগ এবং দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা রোহিঙ্গাদের এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দিচ্ছে।”

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৮০ জন যাত্রী নিয়ে ট্রলারটি যাত্রা করেছিল। আন্দামান সাগরে পৌঁছানোর পর উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে তাদের সংকীর্ণ কুঠুরিতে গাদাগাদি করে রাখা হয়। শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে অনেকেই সেখানেই মারা যান। শেষ পর্যন্ত বড় ঢেউয়ের আঘাতে ট্রলারটি ডুবে যায়।

 

সূত্র- বিডিনিউজ