বাইরে বৃষ্টি নামলেই দুশ্চিন্তায় পড়ে যান ৬৫ বছরের ফুলমতি। কখন কোথা দিয়ে ঘরের চাল চুইয়ে পানি পড়বে, কোথায় ছেলেকে নিয়ে একটু শুকনো জায়গা পাওয়া যাবে—সেই চিন্তায় কাটে তাঁর রাত। জরাজীর্ণ বসতঘরটির চাল দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে ভিজে যায় ঘরের মেঝে, বিছানা ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। সেই ঘরেই ৪০ বছরের প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে বসবাস তাঁর।

একদিকে বয়সের ভারে নুয়ে পড়া ৮০ বছরের স্বামী, অন্যদিকে প্রতিবন্ধী সন্তান। দুজনের দেখভাল আর সংসারের খরচ জোগাতে গিয়ে নিজেই এখন অসহায় হয়ে পড়েছেন ফুলমতি। অথচ এই বয়সে তাঁরই কথা ছিল অন্যের সহায়তা নিয়ে চলার।

ফুলমতির বাড়ি খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার মধ্য বোয়ালখালী পশ্চিমপাড়ায়। স্বামী বয়সের কারণে কাজ করতে পারেন না। সংসারে বড় কোনো উপার্জনক্ষম ছেলে নেই। রয়েছে এক মেয়ে ও ৪০ বছর বয়সী প্রতিবন্ধী ছেলে। ফলে স্বামী-সন্তানের দেখভালসহ সংসারের প্রায় পুরো দায়িত্বই এখন ফুলমতির কাঁধে।

জানা গেছে, গৃহকর্ম করে কোনোভাবে সংসার চালান ফুলমতি। কিন্তু প্রতিবন্ধী ছেলেকে একা রেখে নিয়মিত বাইরে গিয়ে কাজ করাও তাঁর পক্ষে সম্ভব হয় না। সামান্য আয় দিয়েই স্বামীর ওষুধ, ছেলের প্রয়োজনীয় ব্যয় এবং পরিবারের খাবারের খরচ মেটাতে হয় তাঁকে। ফলে অভাব যেন নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এর মধ্যে বসতঘরটিও দীর্ঘদিনের জরাজীর্ণতায় বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ঘরের বিভিন্ন স্থানে ছিদ্র ও দুর্বল হয়ে যাওয়া চাল দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে। টানা বৃষ্টিতে ঘরের ভেতর পানি জমে যায়। বিছানা ও কাপড়চোপড় সরিয়ে শুকনো জায়গা খুঁজতে হয়। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয় প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে।

ফুলমতির জীবন যেন বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। যে বয়সে একজন মানুষের নিজের জন্য নিরাপদ আশ্রয় ও পরিবারের সহযোগিতা পাওয়ার কথা, সেই বয়সেও তিনি স্বামী ও প্রতিবন্ধী সন্তানের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। কিন্তু সামর্থ্য ফুরিয়ে আসায় এখন তাঁর প্রয়োজন মানুষের সহায়তা।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পরিবারটির জন্য একটি নিরাপদ বসতঘর নির্মাণের পাশাপাশি নিয়মিত খাদ্য, চিকিৎসা ও আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে পরিবারটির দুর্ভোগ অনেকটাই কমতে পারে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি মেরুং ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিনা চাকমা বলেন, “ফুলমতির পরিবারের বিষয়টি আমরা জানতে পেরেছি। তাঁদের আর্থিক অবস্থা ও বসতঘরের বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করা হবে। সরকারি সহায়তার আওতায় তাঁরা কী কী সুবিধা পেতে পারেন, তা খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। জরুরি সহায়তার প্রয়োজন হলে সেটিও দেওয়ার চেষ্টা করব।”

দীঘিনালা উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, “বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে পরিবারটির অবস্থা যাচাই করা হবে। প্রতিবন্ধী সদস্যের জন্য সরকারি সুবিধা এবং অসহায় পরিবারের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সহায়তা দেওয়া হবে। বসতঘরটি ঝুঁকিপূর্ণ হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও দেখা হবে।”

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু আশ্বাস নয়—ফুলমতির মতো অসহায় পরিবারের পাশে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে দ্রুত সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া হবে। একটি নিরাপদ ঘর হয়তো ফুলমতির জীবনের সব কষ্ট দূর করবে না, তবে বৃষ্টির রাতে প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে অন্তত নিশ্চিন্তে ঘুমানোর সুযোগ করে দিতে পারে।