সড়ক অবরোধ, পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ও সহিংসতায় কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক। টানা অবরোধে স্থবির হয়ে পড়েছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। খাদ্য ও ওষুধের সংকটের পাশাপাশি বন্ধ হয়ে গেছে কৃষিপণ্য পরিবহন ও বাজারজাতকরণ। আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। এরই মধ্যে অবরোধের কারণে এবার বাতিল করা হয়েছে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব কঠিন চীবর দানোৎসব। এতে স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে হতাশা ও ক্ষোভ।

গত ১১ অক্টোবর থেকে কয়েক দফায় সাজেক সড়কে অবরোধ ও পাল্টা অবরোধ কর্মসূচি চলছে। সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের পাঁচ দফা দাবিতে ডাকা অবরোধের বিপরীতে পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা কমিটি নামে আরেকটি সংগঠন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে পাল্টা অবরোধ কর্মসূচি পালন করছে। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে দীর্ঘদিন ধরে কার্যত অচল হয়ে আছে সাজেকের যোগাযোগব্যবস্থা।

অবরোধের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পরিবহন চলাচল বন্ধ থাকায় পাহাড়ে উৎপাদিত কৃষিপণ্য সময়মতো বাজারজাত করা যাচ্ছে না। অনেক কৃষকের উৎপাদিত পণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, প্রয়োজনীয় কাজে স্থানীয়দেরও সাজেকের বাইরে যাতায়াত করতে হচ্ছে চরম ভোগান্তির মধ্য দিয়ে। খাদ্য, ওষুধসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।

এমন পরিস্থিতিতে সাজেকের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় আয়োজন কঠিন চীবর দানোৎসব বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বৌদ্ধ ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী, মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তুলা থেকে সুতা তৈরি, সুতা থেকে কাপড় বোনা এবং সেই কাপড় দিয়ে চীবর তৈরি করে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের দান করা হয়। ধর্মীয় বিশ্বাসে কঠিন চীবর দান অত্যন্ত পুণ্যময় ও শ্রেষ্ঠ দান হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু চলমান অবরোধের কারণে এবার সেই ধর্মীয় আয়োজনও করা সম্ভব হচ্ছে না।

বাঘাইহাট এলাকায় অবস্থিত বনানী বনবিহারের কঠিন চীবর দানোৎসব পরিচালনা কমিটির স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে সম্প্রতি এ তথ্য জানানো হয়। পরিচালনা কমিটি জানান, সাজেকের চলমান অবস্থা বিবেচনায় এবং নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য দয়াধন চাকমা বলেন, স্বজাতি ও নিজ ধর্মের মানুষের ধর্মীয় উৎসব পালনে অবরোধের কারণে বাধা সৃষ্টি হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। এটি মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি ও সামাজিক সম্প্রীতির জন্যও নেতিবাচক। এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই কাম্য নয়।

বাঘাইছড়ি পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রহমতুল্লাহ খাজা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অবরোধ চলায় সাজেকের মানুষ নানা সংকটে পড়েছেন। খাদ্য ও চিকিৎসার মতো মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করাও কঠিন হয়ে উঠছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্টদের দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

এদিকে, অবরোধকারীদের সঙ্গে প্রশাসনের একাধিক দফা বৈঠক হলেও এখনো সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। দাবি-দাওয়া ও পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির মধ্যে আটকে আছে সাজেকের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।

সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত অবরোধ প্রত্যাহার করে যোগাযোগব্যবস্থা স্বাভাবিক করা না হলে সাজেকে খাদ্য ও চিকিৎসাসংকট আরও প্রকট হবে। একই সঙ্গে কৃষি, ব্যবসা, পর্যটনসহ স্থানীয় অর্থনীতিতে ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে। মানুষের জীবিকা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সংকট নিরসনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।