২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ভয়াবহ সামরিক অভিযানের মুখে প্রাণ বাঁচাতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। মানবিক বিবেচনায় সীমান্ত খুলে দেওয়ার সেই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হলেও প্রায় এক দশক পর এসে এই সংকট বাংলাদেশের জন্য এক জটিল মানবিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসাব মতে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ থেকে ১৩ লাখের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যার একটি বড় অংশই শিশু ও কিশোর। একই সময়ে রাখাইনে নতুন করে শুরু হওয়া অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে আরও হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষ বাংলাদেশে প্রবেশ করায় আগে থেকেই চাপের মুখে থাকা শরণার্থী ব্যবস্থাপনা এখন আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে।
তহবিল সংকটে মানবিক কার্যক্রম
এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের পেছনে অন্যতম বড় কারণ আন্তর্জাতিক অর্থায়নের তীব্র ঘাটতি। ইউক্রেন যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক দাতাদের মনোযোগ এবং তহবিল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে ২০২৬ সালের জন্য জাতিসংঘের যৌথ মানবিক সাড়া পরিকল্পনায় আগের বছরের তুলনায় বাজেট অনেকটাই কাটছাঁট করা হয়েছে।
মানবিক সংস্থাগুলো সতর্ক করে জানিয়েছে, বর্তমান বরাদ্দ দিয়ে কেবল জীবন রক্ষাকারী মৌলিক সেবাগুলো কোনোমতে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদি কোনো উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এই তহবিল সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে খাদ্য নিরাপত্তায়; রেশন কমে যাওয়ায় ক্যাম্পের শিশু, গর্ভবতী নারী ও বৃদ্ধদের মধ্যে পুষ্টিহীনতার হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এর পাশাপাশি অর্থ সংকটে বেশ কয়েকটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরো ক্যাম্প এলাকায় একটি স্থায়ী জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে অভিবাসন
একদিকে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে একটি পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে জীবন ও ভবিষ্যতের তাগিদে অনেক রোহিঙ্গা মানবপাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে বঙ্গোপসাগর বা আন্দামান সাগর পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার উদ্দেশ্যে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা করছে, যা প্রায়শই ট্রাজিক নৌকাডুবি ও মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব
রোহিঙ্গা সংকটের এই বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব কেবল ক্যাম্পের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রাকেও বিপর্যস্ত করে তুলেছে। স্থানীয় শ্রমবাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা, আবাসন ব্যয় বৃদ্ধি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভের কারণ হচ্ছে।
এর ওপর পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পগুলোর কারণে ওই অঞ্চলের বনভূমি, বন্যপ্রাণী ও ভূগর্ভস্থ পানির অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, যা বর্ষা মৌসুমে ভয়াবহ ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রত্যাবাসনই একমাত্র সমাধান, কিন্তু অগ্রগতি নেই
বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র স্থায়ী সমাধান হলো নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। কিন্তু মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, গৃহযুদ্ধ, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রশ্নে অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া গত ৯ বছরেও কার্যত আলোর মুখ দেখেনি।
অল্প কিছু রোহিঙ্গাকে তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন করা হলেও তা মোট জনসংখ্যার তুলনায় একেবারেই নগণ্য।
আঞ্চলিক সংকটে রূপান্তর
ফলে এটি এখন আর কেবল একটি সাময়িক সমস্যা নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় হুমকি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জোরালো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং মিয়ানমারের ভেতরে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি না হলে বিশ্বের বৃহত্তম এই রোহিঙ্গা সংকট আগামীতে আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে।
সরকারি অবস্থান
রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) সদস্য দেশগুলোর সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, মিয়ানমারে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনই এ সংকটের একমাত্র কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। তিনি তাদের নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত সহযোগিতা ও সমর্থন কামনা করেন।
বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গা সংকটকে সবসময় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরে রাখতে চায় বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি রোহিঙ্গাদের মানবিক ও চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য আইসিআরসিকে ধন্যবাদ জানান এবং বলেন, এই ইস্যু বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।
জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী ক্যারল ফ্লোর-স্মেরেজনাইক রোহিঙ্গাদের প্রতি বাংলাদেশের উদারতার প্রশংসা করে বলেন, এত বড় জনগোষ্ঠীর বোঝা বাংলাদেশের একার পক্ষে বহন করা সম্ভব নয় এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর সমর্থন প্রয়োজন।
সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই ও কার্যকর সমাধান রাখাইন রাজ্যেই নিহিত এবং এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে শুধু মানবিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, সম্মানজনক ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে আরও সক্রিয় ও ফলপ্রসূ ভূমিকা নিতে হবে।
আন্তর্জাতিক সহায়তা ও পরিকল্পনা
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা এবং কক্সবাজার ও ভাসানচরের ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মানবিক সহায়তার জন্য ২০২৬ সালে ৭১ কোটি ৫ লাখ মার্কিন ডলারের আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়েছে জাতিসংঘ ও এর অংশীদার সংস্থাগুলো।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। ২০২৪ সালের শুরু থেকে নতুন করে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
জাতিসংঘ বলছে, বৈশ্বিক সংঘাত ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নিরাপত্তা খাতের সেবা হুমকির মুখে পড়েছে। এবারের পরিকল্পনা ২০২৫ সালের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম হলেও এটি কেবল জরুরি জীবনরক্ষাকারী সহায়তার জন্য নির্ধারিত।
খাতভিত্তিক বরাদ্দের প্রস্তাবে খাদ্য সহায়তার জন্য ২৪ কোটি ৭৩ লাখ ডলার, বাসস্থানের জন্য ১২ কোটি ৮০ লাখ, পানি ও স্যানিটেশন খাতে ৬ কোটি ১২ লাখ, শিক্ষায় ৫ কোটি ২৭ লাখ এবং স্বাস্থ্যসেবায় ৪ কোটি ৯৯ লাখ মার্কিন ডলার চাওয়া হয়েছে।
ডেটা ব্যবস্থাপনায় নতুন উদ্যোগ
মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে কক্সবাজারে অবস্থানরত প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার তথ্য ও ডেটাবেজ বাংলাদেশ সরকারের একটি নতুন সার্ভারে সংরক্ষিত হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) ইতোমধ্যে সার্ভার তৈরির কাজ সম্পন্ন করেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ শেষে সার্ভারটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এরপর ইউএনএইচসিআর ধাপে ধাপে বায়োমেট্রিক ও নিবন্ধন তথ্য বাংলাদেশি সার্ভারে স্থানান্তর করবে।
আন্তর্জাতিক পরিদর্শন ও সহায়তা
সম্প্রতি তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান কক্সবাজারের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন এবং তুরস্কের সহায়তায় পরিচালিত চিকিৎসা ও মানবিক কার্যক্রম ঘুরে দেখেন।
অন্যদিকে ফিনল্যান্ড রোহিঙ্গা মানবিক সহায়তায় ২০ লাখ ইউরো অনুদান দিয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, রোহিঙ্গাদের একটি বড় অংশ এখনো মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল, এবং অর্থায়ন কমে গেলে নারী, শিশু, বয়স্ক ও নতুন আগত রোহিঙ্গারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রোহিঙ্গা সংকট যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই তা বাংলাদেশের জন্য বড় বোঝা হয়ে উঠছে। মানবিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে আশ্রয় দেওয়া হলেও দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট দেশের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও শক্তিশালী কূটনৈতিক চাপ ও কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।


