পবিত্র ঈদুল আজহায় দেশজুড়ে চলছে মুসলিমদের উৎসবের আমেজ। কিন্তু কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে ঈদের সেই আনন্দ যেন বহু আগেই হারিয়ে গেছে। নয় বছর ধরে নিজভূমি মিয়ানমারের আরাকান থেকে বিচ্ছিন্ন লাখো রোহিঙ্গার জীবনে এবারও ঈদ এসেছে দীর্ঘশ্বাস, অনিশ্চয়তা ও হতাশা নিয়ে।
বৃহস্পতিবার (২৮ মে) সকাল সাড়ে ৭টায় শিবিরগুলোতে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হলেও অধিকাংশ রোহিঙ্গার চোখেমুখে ছিল না উৎসবের উচ্ছ্বাস। বরং ছিল স্বজনহারা জীবনের বেদনা ও নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আকুতি।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযান ও নির্যাতনের মুখে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় লাখো রোহিঙ্গা। মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দিলেও প্রায় এক দশক পার হতে চললেও প্রত্যাবাসনের কোনো কার্যকর সমাধান এখনো দৃশ্যমান হয়নি। বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ক্যাম্পগুলোতে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গত এক বছরে নতুন করে আরও দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
ক্যাম্পগুলো ঘুরে দেখা গেছে, ঈদকে ঘিরে অনেক পরিবারে রান্নার পর্যাপ্ত উপকরণ পর্যন্ত ছিল না। অনেকেই জানিয়েছেন, আগের তুলনায় রেশন কমে যাওয়ায় দৈনন্দিন খাবার জোগাড় করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে ঈদের আনন্দের চেয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রামই এখন তাদের বড় বাস্তবতা।
টেকনাফের এক আশ্রয়শিবিরের একাধিক বাসিন্দা জানান, আগে ঈদ মানেই ছিল আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি, কবর জিয়ারত, পারিবারিক মিলনমেলা ও উৎসবমুখর পরিবেশ। কিন্তু এখন ঈদ এলেও তাদের কাছে দিনটি অন্য সাধারণ দিনের মতোই। কাঁটাতারের ভেতর বন্দি জীবন তাদের মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
রোহিঙ্গা নেতারাও বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে এমন জীবনে আটকে থাকায় মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। অনেক পরিবার মনে করছে, আন্তর্জাতিক মহলের আশ্বাসের বাস্তব প্রতিফলন নেই। প্রত্যাবাসন নিয়ে বিভিন্ন সময় আশার কথা শোনা গেলেও বাস্তবে কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় ঈদও এখন তাদের কাছে বিষাদের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ সরকারও দীর্ঘমেয়াদি এ সংকট মোকাবিলায় বাড়তি চাপের মুখে পড়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, রোহিঙ্গা সংকট এখন শুধু মানবিক বিষয় নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, কূটনীতি ও নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই ও কার্যকর সমাধান রাখাইন রাজ্যেই নিহিত এবং এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে শুধু মানবিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, সম্মানজনক ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে আরও সক্রিয় ও ফলপ্রসূ ভূমিকা নিতে হবে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, মিয়ানমারে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনই এ সংকটের একমাত্র কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। তিনি তাদের নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত সহযোগিতা ও সমর্থন কামনা করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদও সম্প্রতি বলেছেন, জাতিসংঘ শুরু থেকেই রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে বিশ্বসম্প্রদায়ের মনোযোগের কেন্দ্রে রেখেছে, যা অত্যন্ত প্রশংসাযোগ্য এবং আশাব্যঞ্জক।
তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘বাংলাদেশ সর্বদা শান্তিপূর্ণ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই অভিবাসনে বিশ্বাসী। তবে রোহিঙ্গা সংকট বর্তমানে একটি জটিল ও স্পর্শকাতর ইস্যুতে পরিণত হয়েছে, যা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।’
এদিকে, রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) সদস্য দেশগুলোর সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এছাড়া, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা এবং কক্সবাজার ও ভাসানচরের ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মানবিক সহায়তার জন্য ২০২৬ সালে ৭১ কোটি ৫ লাখ মার্কিন ডলারের আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়েছে জাতিসংঘ ও এর অংশীদার সংস্থাগুলো।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে ক্যাম্পগুলোতে বিপুল জনগোষ্ঠীর অবস্থানের কারণে স্থানীয় এলাকায় নানা সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত সমস্যা বাড়ছে। মানবপাচার, মাদক চোরাচালান, সন্ত্রাসী তৎপরতা ও সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। একই সঙ্গে বনভূমি উজাড়, পরিবেশ বিপর্যয় ও স্থানীয় শ্রমবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় ক্যাম্প ব্যবস্থাপনাতেও সংকট দেখা দিয়েছে। জানা গেছে, অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা তহবিল সংকটে পড়ায় খাদ্য ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রম আগের তুলনায় সীমিত হয়ে গেছে। ফলে ঈদ উপলক্ষে আগের বছরের মতো পর্যাপ্ত কোরবানির মাংস বিতরণও সম্ভব হয়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রোহিঙ্গা সংকট যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই তা বাংলাদেশের জন্য বড় বোঝা হয়ে উঠছে। মানবিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে আশ্রয় দেওয়া হলেও দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট দেশের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও শক্তিশালী কূটনৈতিক চাপ ও কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।


