কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বেকারত্ব, আয়-রোজগারের সীমাবদ্ধতা ও অনিশ্চিত জীবনের সুযোগ নিয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে অনলাইন জুয়া। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করে এসব জুয়ার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন ক্যাম্পের অনেক তরুণ। জুয়ায় টাকা হারিয়ে ঋণগ্রস্ত হওয়ার পর কেউ কেউ পরিবারের কাছ থেকে টাকা আদায়ের জন্য নিজেরাই অপহরণের নাটক সাজাচ্ছেন। আবার কোথাও পাওনাদারদের চাপ ও বিরোধ থেকে তৈরি হচ্ছে সহিংস পরিস্থিতি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও ক্যাম্পে বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে অনলাইন জুয়ার যোগসূত্রের বিষয়টি উঠে এসেছে।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের ‘জয়েন্ট প্রটেকশন মনিটরিং’ প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অনলাইন জুয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের শুরুতে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, অনলাইন জুয়ার কারণে পারিবারিক সহিংসতা এবং ইয়াবা ব্যবসায় তরুণ রোহিঙ্গাদের সম্পৃক্ততা বাড়ছে।
চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকের (এপ্রিল-জুন) প্রতিবেদনে হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, শারীরিক নির্যাতন, গোলাগুলি, সশস্ত্র গ্রুপে যোগদানসহ ৪৭০টি ঘটনার কথা তুলে ধরা হয় ইউএনএইচসিআরের প্রতিবেদনে, যাতে ৫৯২ জন রোহিঙ্গা ভুক্তভোগী হয়েছেন। প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) এমন ৪৫৫টি ঘটনায় ভুক্তভোগী হয়েছেন ৮৩২ রোহিঙ্গা। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের প্রকাশিত প্রতিবেদনেও এ তথ্য জানানো হয়েছে।
ইউএনএইচসিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়, আর্থিক কষ্ট ও জীবিকার সীমাবদ্ধতার কারণে উচ্চ আসক্তির অনলাইন জুয়া দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে দায়দেনা নিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে বিরোধও বাড়ছে। ঘটছে শারীরিক সহিংসতাও।
মিয়ানমারে গিয়ে যুদ্ধ করা আর ক্যাম্পে সশস্ত্র গ্রুপ প্রবেশে বিভিন্ন সভা হওয়ার কথাও এসেছে ইউএনএইচসিআরের প্রতিবেদনে। সীমিত জায়গার মধ্যে কর্মক্ষম বিপুল জনগোষ্ঠীর অলস বসে থাকা ক্যাম্পে অপরাধ বাড়ার কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
ক্যাম্পে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে বিভিন্ন অপরাধের যোগসূত্রের কথা বলছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারাও।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, ক্যাম্পে সংঘটিত কিছু অপহরণের ঘটনায় ঋণ ও জুয়ায় অর্থ হারানোর বিষয়টি সামনে এসেছে। তাদের তদন্তে এমন ঘটনাও পাওয়া গেছে, যেখানে পরিবারের কাছ থেকে টাকা আদায়ের জন্য কেউ কেউ নিজেরাই অপহরণের ঘটনা সাজিয়েছেন।
তবে অনলাইন জুয়া বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, ভিপিএন ব্যবহার করে জুয়ার সাইটে প্রবেশ করায় ব্যবহারকারীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। একইভাবে স্থানীয় ব্যক্তিদের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ক্যাম্পে সিমকার্ড ব্যবহারের ঘটনাও নজরদারিকে জটিল করে তুলছে।
ক্যাম্পের যেসব এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক তুলনামূলক ভালো, সেখানে দলবেঁধে গিয়ে অনলাইন জুয়া খেলার কথাও জানিয়েছেন সেখানকার কয়েকজন রোহিঙ্গা।
স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জুয়ায় অর্থ হারিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়া রোহিঙ্গাদের সঙ্গে পাওনাদারদের বিরোধের ঘটনাও ঘটছে। কোথাও পরিবারের কাছে টাকা চাওয়া, ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতা এবং পাওনাদারদের চাপ থেকে মারধর কিংবা অপহরণের মতো ঘটনাও সামনে এসেছে।
গত ৮ সেপ্টেম্বর চার নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের একটি খেলার মাঠের কাছে নবী হোসেন নামের এক রোহিঙ্গাকে বিবস্ত্র ও রক্তাক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। তার এক আত্মীয়ের ভাষ্য, বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে ধার করা টাকা পরিশোধ করতে না পারায় তার ওপর চাপ তৈরি হয়েছিল। পরে তাকে মারধর করা হয়। আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতাকেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। সীমিত জায়গার মধ্যে বিপুলসংখ্যক কর্মক্ষম মানুষ দীর্ঘ সময় কর্মহীন থাকায় তাদের একটি অংশ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
অনলাইন জুয়া থেকে তরুণদের দূরে রাখতে ক্যাম্পে বিভিন্ন সামাজিক ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমে তাদের যুক্ত করার উদ্যোগও রয়েছে। তবে সীমিত জীবিকার সুযোগ ও দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার কারণে তরুণদের একটি অংশের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
ক্যাম্পে বিপুলসংখ্যক শিশুর শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ইউএনএইচসিআর ও বাংলাদেশ সরকারের হিসাব অনুযায়ী, কক্সবাজার ও ভাসানচর মিলিয়ে বাংলাদেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখের বেশি। তাদের অর্ধেকেরও বেশি শিশু।
তবে সরকারি নিবন্ধনের বাইরে থাকা রোহিঙ্গাদের হিসাব ধরলে বাংলাদেশে মোট রোহিঙ্গার সংখ্যা আরও বেশি বলে মনে করা হয়। বিভিন্ন বেসরকারি ও অন্যান্য সংস্থার হিসাবে, অনিবন্ধিতসহ দেশে রোহিঙ্গার মোট সংখ্যা ১৫ লাখ হতে পারে।
আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থাকা শিশুদের ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। ক্যাম্পের বিভিন্ন লার্নিং সেন্টার ও মাদ্রাসায় মিয়ানমারের কারিকুলাম অনুযায়ী পড়াশোনা করছে রোহিঙ্গা শিশুরা। তবে প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত থাকায় তাদের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
রোহিঙ্গাদের জীবিকার সুযোগ তৈরির বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বিভিন্ন সময়ে পরামর্শ দিলেও দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও স্থানীয় শ্রমবাজারের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের কথা বিবেচনা করে এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান ভিন্ন।
শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমানের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের সহিংসতা, অধিকারবঞ্চনা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাব রোহিঙ্গাদের একটি প্রজন্মের ওপর প্রভাব ফেলেছে। এই পরিস্থিতিতে ক্যাম্পের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা ছিল। তবে বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
অনলাইন জুয়া সেই সংকটের সঙ্গে নতুন করে আর্থিক ও সামাজিক ঝুঁকি তৈরি করছে। জুয়ায় অর্থ হারিয়ে ঋণগ্রস্ত হওয়া, পাওনাদারদের চাপ, পারিবারিক বিরোধ এবং সহিংসতার মতো ঘটনা ক্যাম্পের অনিশ্চিত জীবনকে আরও জটিল করে তুলছে।


