কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আবারও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে শত শত ঘরবাড়ি। সোমবার দিবাগত গভীর রাতে উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের ১৬ নম্বর শফিউল্লাহ কাটা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি-৪ ব্লকে লাগা আগুনে অন্তত ৪৪৮টি বসতঘর, ১০টি লার্নিং সেন্টার, ২টি মসজিদ ও ১টি মক্তব সম্পূর্ণভাবে পুড়ে ছাই হয় যায়। আগুনে সর্বস্ব হারিয়ে উন্মুক্ত স্থানে দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন প্রায় ৩ হাজার রোহিঙ্গা।

সোমবার দিবাগত রাত আড়াইটা। চারদিক যখন নিস্তব্ধ, ঘুমে আচ্ছন্ন পুরো ক্যাম্প- হঠাৎ করেই আগুনের লেলিহান শিখা আর আতঙ্কিত মানুষের চিৎকারে ঘুম ভাঙে ডি-৪ ব্লকের বাসিন্দাদের। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে ঘনবসতিপূর্ণ শেডগুলোতে। প্রাণ বাঁচাতে শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের নিয়ে দিগ্বিদিক ছুটতে থাকেন মানুষ। কেউ সন্তানকে কোলে, কেউ বৃদ্ধ মা–বাবাকে ধরে অন্ধকারে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছোটেন।

ডি-৪ ব্লকের বাসিন্দা লাইলা বেগম বলেন, “ঘুমের মধ্যে হঠাৎ আগুন আর চিৎকারে ঘুম ভাঙে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই চারদিকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। সন্তানদের নিয়ে শুধু প্রাণ বাঁচাতে দৌড়েছি। সবকিছু আগুনে পুড়ে গেছে।”

ডি-৩ ব্লকের মৃত আব্দুর রাজ্জাকের স্ত্রী রাজিয়া বেগম (৭০) বলেন, “ঘুমের মধ্যেই আগুন লাগে। উঠতে দেরি হয়ে যায়। সবকিছু আগুনে পুড়ে গেছে। এখন মাথা গোঁজার জায়গা নেই।”

তিনি আরও বলেন, “আমি বৃদ্ধ মানুষ, দৌড়াতে পারি না। অন্যরা ধরে না নিলে হয়তো বাঁচতাম না। এই বয়সে আবার সব হারাতে হবে ভাবিনি। কোথায় থাকব, কে দেখবে- কিছুই জানি না। একটু সাহায্য পেলে হয়তো বেঁচে থাকার সাহস পেতাম।”

ডি-২ ব্লকের বাসিন্দা ৬০ বছর বয়সী প্রতিবন্ধী মোহাম্মদ বলেন, “আমি ঠিকমতো হাঁটতে পারি না। আগুন লাগার সময় বের হতে খুব কষ্ট হয়েছে। অন্যরা না ধরলে হয়তো বাঁচতাম না। সবকিছু আগুনে পুড়ে গেছে। ঘর থেকেও কিছু বের করতে পারিনি। এখন শরীর নিয়ে খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছি।”

একই ব্লকের বাসিন্দা হাফেজ কলিম উল্লাহ বলেন, “আগুনে আমার অসংখ্য বই, কিতাব, রেডিও ও টেপ পুড়ে গেছে। এগুলোই ছিল আমার সম্বল ও শিক্ষাদানের একমাত্র উপকরণ। এই বই-কিতাবগুলো শুধু কাগজ নয়, আমার জীবনের সাধনা। আগুনে সব হারিয়ে এখন আমি নিঃস্ব। ক্যাম্পে আমার শিক্ষার্থীদের পড়ানোর মতো আর কিছুই রইল না। কিতাবগুলো চোখের সামনে পুড়ে যেতে দেখেছি। ঘর হারানো কষ্টের চেয়েও বই হারানোর কষ্ট ভূলতে পারব না।”

ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, রাত ৩টার দিকে ডি-৪ ব্লকের একটি লার্নিং সেন্টার এলাকা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রবল বাতাসের কারণে আগুন দ্রুত আশপাশের বসতঘরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে কক্সবাজার, উখিয়া, রামু ও টেকনাফ ফায়ার সার্ভিসের মোট ৮টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় সাড়ে ৩ ঘণ্টার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে ভোর পৌনে ৬টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়।

উখিয়া উপজেলা প্রশাসনের প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে, আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কয়েক হাজার রোহিঙ্গা। নির্যাতিত হয়ে নিজ দেশ ছেড়ে আশ্রয় নেওয়া এসব মানুষেরা মুহূর্তেই হারিয়েছেন মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু। বর্তমানে তারা পাশের লার্নিং সেন্টার, মসজিদ, মক্তব ও খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক সৈয়দ মো. মোরশেদ হোসেন জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে বসতঘরের চুলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আগুনের সুনির্দিষ্ট কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব জানানো সম্ভব নয়।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে উখিয়া উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রাথমিক সহায়তা কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির কাজ চলছে। একই সঙ্গে অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিফাত আসমা বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গাদের জন্য জরুরি সহায়তার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কেন বারবার ক্যাম্পে অগ্নিকাণ্ড ঘটছে, তা খতিয়ে দেখা হবে।”

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত ৮ এপিবিএনের অধিনায়ক রিয়াজ উদ্দিন আহমদ জানান, আগুনের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্ধার ও নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করে। ক্ষতিগ্রস্তদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। ক্যাম্পে কেন বার বার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে তা খতিয়ে দেখা হবে।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, “অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর জন্য তাৎক্ষণিকভাবে জরুরি ত্রাণ সহায়তা নিশ্চিত করা হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে আগুনের সুনির্দিষ্ট কারণ উদ্ঘাটনে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাজ করছে।”

উল্লেখ্য, গত ২৫ ও ২৬ ডিসেম্বর উখিয়ার পৃথক দুটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। একের পর এক এমন অগ্নিকাণ্ড পরিকল্পিত নাশকতা কি না- তা নিয়েও সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ ও তদন্তের দাবি উঠেছে।