আবার সাগরপথে সক্রিয় হয়ে উঠেছে কক্সবাজার উপকূলের মানবপাচারকারী চক্র। উখিয়া ও টেকনাফের শক্তিশালী সিন্ডিকেটের শতাধিক পাচারকারী চক্রটির সঙ্গে জড়িত বলে শোনা যায়। পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও কোস্টগার্ডসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থার নানামুখী অভিযানের পরও বন্ধ করা যাচ্ছে না মানবপাচার। ঘাট পরিবর্তনসহ নানা কৌশলে চলছে এসব অপরাধ।
জানা যায়, স্থানীয়দের পাশাপাশি তারা বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে শিশু, নারী ও পুরুষ পাচারের জন্য সংগ্রহ করে। নানা কৌশলে প্রলোভন দেখিয়ে সুযোগ বুঝে ট্রলারে তুলে দেওয়া হয় তাদের। এরমধ্যে যাদের আর্থিক অবস্থা ভালো, দালালরা তাদের আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায় করে।
পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, 'কক্সবাজারে মানবপাচার আইনে ২০১২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ৭৪১টি মামলা হলেও বিচার হয়নি একটিরও। বিচারক সংকট ও সাক্ষীর অনুপস্থিতির কারণে আটকে আছে মানবপাচারের এসব মামলা। তার উপর চাপ বাড়িয়েছে সরকার পরিবর্তনের পর দেশের চলমান নতুন সংকট। মামলার দীর্ঘ সূত্রতার কারণে মানবপাচারের শিকার লোকজন ক্ষতিগ্রস্ত ও বিচার বঞ্চিত হচ্ছে। পাশাপাশি ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাওয়ায় একই অপরাধ করে যাচ্ছে একাধিক চক্রের সদস্যরা।
পুলিশের অপর একটি পরিসংখ্যান বলছে, '২০২০ সাল থেকে ২০২৪ এর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কক্সবাজারে মানবপাচার আইনে মামলা হয়েছে ১০৪টি। যার মধ্যে, কক্সবাজার সদর মডেল থানায় ৩৬, চকরিয়া থানায় ২, মহেশখালী থানা ৮, রামু থানা ৬, উখিয়া থানায় ১৮, টেকনাফ মডেল থানায় ৩১, পেকুয়া থানায় ১ ও ঈদগাও থানায় মামলা হয়েছে ২টি।
বেসরকারি সংস্থা নোঙরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৮ বছরে কক্সবাজারের আট থানায় মানবপাচার মামলা হয়েছে ৬৩৭টি। এর মধ্যে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় ৯৭টি, রামু থানায় ২৪টি, উখিয়া থানায় ৬৮টি, টেকনাফ মডেল থানায় ২১৮টি, চকরিয়া থানায় ১৯টি, কুতুবদিয়া থানায় একটি, মহেশখালী
থানায় ৩৬টি এবং পেকুয়া থানায় ৮টি মামলা হয়েছে। থানার এসব মামলা ছাড়া ট্রাইব্যুনালেও অনেক মামলা রয়েছে।
মামলাগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, '৭৪১ মানবপাচার মামলার একটিও নিষ্পত্তি হয়নি। সাক্ষীর অভাবে মামলায় অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। একপ্রকার থমকে আছে মামলাগুলো। এছাড়াও অধিকাংশ মামলায় আসামিদের সম্পদ ক্রোকের জন্য আদালত আদেশ দিলেও একটিও কার্যকর এ পর্যন্ত হয়নি। চলতি সালে সাগরপথে মানবপাচার
আর প্রাণহানিকে ঘিরে আবারও আলোচনায় চলে আসে কক্সবাজার। থেমে থেমে মানবপাচার চক্রের উৎপাত বেড়েছে।
সম্প্রতি এরকম একটি চক্রের ফাঁদে পড়েছিলেন, রোহিঙ্গা নারী উম্মে হাবিবা। তার দেওয়া তথ্যমতে, '৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা কন্ট্রাক্টে আমার ছোট বোনকে নিয়ে সাগরপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ক্যাম্প ত্যাগ করি। এজন্য দালালকে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা দিয়েছি। বাকি ৩ লাখ টাকা মালয়েশিয়া পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দালালরা টেকনাফের একটি বাড়িতে ২দিন আটকে রাখে। অবশেষে যাত্রার প্রস্তুতিকালে পুলিশের কাছে ধরা পড়েছি। তার দাবি, বাড়িতে এবং পাহাড়ে আরও অনেক মানুষ আটকা পড়ে আছেন।
মানবপাচারকারী সিন্ডিকেটের সদস্যরা হলেন, 'টেকনাফ সদর ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের নতুন পল্লানপাড়ার মৃত সিরাজুল ইসলামের ছেলে আরিফুল ইসলাম প্রকাশ আরিফ ও পালংখালী ইউনিয়নের নাজির হোসেনের ছেলে জিয়াবুল হক পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত। তাদের গত বছর র্যাব-১৫ আটক করেছিল। পরে জামিনে বের হয়ে আবার এ কাজে জড়িয়ে পড়ে। আরিফের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে দুটিসহ চারটি মামলা রয়েছে।
অন্যজন উখিয়ার পালংখালী এলাকায় অপহরণ, মুক্তিপণ ও মানবপাচার মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। জিয়াবুল মানবপাচার একটি চক্রের মূল হোতা। সে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের সঙ্গে যোগসাজশে অপহরণ, মুক্তিপণ ও মানবপাচারের একটি সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে থাকেন বলে জানা গেছে। জিয়াবুলের বিরুদ্ধে উখিয়া থানায় মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে আরও কয়েকটি মামলা রয়েছে।
এছাড়া চক্রের সাথে জড়িত মো. হাছন প্রকাশ আতুরী, সুলতান মাহমুদ উল্লাহ, রশিদ মিয়া মেম্বার, আবদুল আমিন।
এই সিন্ডিকেট সদস্যরা পাহাড়ের ভেতর অবস্থান নিয়ে মানবপাচার ও অপহরণের পর মুক্তিপণ দাবি করে। মানবপাচার সিন্ডিকেটের সদস্যদের সঙ্গে গোপনে সখ্যতা রয়েছে কক্সবাজারের উপকূল ঘেঁষা ইউপি চেয়ারম্যান মেম্বারদের। মূলত তাদের ছত্রছায়ায় এসব উপকূল পাচার রুট হিসেবে ব্যবহার করছে চক্রটি।"
পুলিশ ও স্থানীয় সুত্রের দেয়া তথ্যমতে, 'উখিয়া ও টেকনাফের সাগর তীরবর্তী কয়েকটি এলাকার পাশাপাশি কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি পয়েন্ট দিয়ে মানবপাচারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পাচারকারীরা। এর মধ্যে-কক্সবাজার শহরের নুনিয়াছটা, ফিশারিঘাট, নাজিরার টেক, সমিতিপাড়া; মহেশখালীর সোনাদিয়া, গোরকঘাটা, কুতুবজোম, ধলঘাটা; উখিয়ার সোনারপাড়া, রেজুর খাল, ইনানী, ছেপটখালী, মনখালী; টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া, নোয়াখালীপাড়া, মহেশখালীয়া পাড়া, শাহপরীর দ্বীপ, কাটাবনিয়া, খুরেরমুখ, হাদুরছড়া, জাহাজপুরা, কচ্ছপিয়া, শামলাপুর, সদরের ঈদগাঁও ও খুরুশকুল।
কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ফরিদুল আলম জানান, '২০১১ সাল থেকে কক্সবাজারে মানবপাচার আইনে ৬৩৭টি মামলা হলেও তার একটিরও বিচারকাজ শেষ হয়নি। মামলাগুলোর কিছু কিছু চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করা হয়েছে। তবে মামলাগুলোর সাক্ষী পাওয়া নিয়ে একটু কঠিন। তবু রাষ্ট্রপক্ষ চেষ্টা চালাচ্ছে এসব মামলা নিষ্পত্তি করতে। এরই মাঝে সরকার পরিবর্তনের কারণে বদলেছে পাবলিক প্রসিকিউটরও।
কক্সবাজারের নতুন পাবলিক প্রসিকিউটর মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, 'তিনি নতুন যুক্ত হয়েছেন। এখনো মামলার ফাইলগুলো পাননি। পর্যায়ক্রমে তিনি মানবপাচার মামলা নিয়ে উদ্যোগ নেবেন।
একই অবস্থা মানবপাচার মামলার আরেক আদালত কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাব্যুনাল-২ এর। এখানেও নতুন পিপি নিয়োগ হয়েছেন মীর মোশাররফ হোসেন টিটু। তিনিও এখনো ফাইল না পাওয়ায় মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে কিছুই জানাতে পারে নি। তবে এসব মামলার বিচারকাজ শেষ করার জন্য উদ্যোগ নেবার কথা জানান।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে মাঝেমধ্যে সিন্ডিকেট সদস্যরা ধরা পড়লেও আইনের ফাঁক ফোকরে জেল থেকে বেরিয়ে আবারও শুরু করে মানবপাচার। স্থানীয়দের পাশাপাশি মালয়েশিয়া পাচারভিত্তিক সিন্ডিকেটে রয়েছে রোহিঙ্গারাও। তারা ক্যাম্পভিত্তিক কাজ করে।
কক্সবাজারের জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জসিম উদ্দিন বলেন,'আগে-পরে মানবপাচারে জড়িতদের মামলাগুলো পর্যবেক্ষণ করে অভিযান চালানো হবে। আমাদের সঙ্গে যৌথ বাহিনীও কাজ করছে। তাদের নলেজেও আছে বিষয়টি। বিভিন্ন সময় থানা পুলিশ মানবপাচারের শিকার নারী-পুরুষ উদ্ধার করেছেন। একই সঙ্গে একাধিক দালাল ও পাচারকারী চক্রের সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছেন। পুলিশ চিহ্নিত ঘাটগুলোতে ইতিমধ্যে তৎপরতা বাড়িয়েছে।"
-পার্বত্য সময়


