বাংলাদেশ–মিয়ানমার সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণের ঘটনা গত কয়েক মাসে উদ্বেগজনক মাত্রায় বেড়েছে। গত বছরের জুলাই থেকে আজ (১৩ জানুয়ারি) পর্যন্ত সীমান্তজুড়ে অন্তত ৭৬টি মাইন বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় কমপক্ষে পাঁচজন নিহত এবং অন্তত ৬০ জন আহত হয়েছেন। শুধু মানুষই নয়, দুইটি হাতিও এই মাইন বিস্ফোরণের শিকার হয়েছে।

গণমাধ্যম ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে এসব ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত হওয়া গেছে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট ঘটনার একটি অংশ সরাসরি বাংলাদেশের ভেতরে ঘটেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করে তুলেছে। বাংলাদেশের সীমানার অভ্যন্তরে আটটি মাইন বিস্ফোরণের ঘটনায় আটজন আহত ও একজন নিহত হয়েছেন। সীমান্তরেখা বরাবর সংঘটিত ২৩টি বিস্ফোরণে আহত হয়েছেন অন্তত ১৮ জন। আর সীমান্তের খুব কাছাকাছি মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সংঘটিত ৪৫টি বিস্ফোরণে ৩৪ জন আহত এবং চারজন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
সীমান্ত এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে সহিংসতার ধরন বদলে গেছে। গুলি ও মর্টার শেলের পাশাপাশি স্থলমাইন এখন সবচেয়ে নীরব ও ভয়ংকর অস্ত্র হয়ে উঠেছে। সীমান্ত নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে মাইন বসানো হলেও এর সরাসরি শিকার হচ্ছে সীমান্তের সাধারণ মানুষ। মাছ ধরতে যাওয়া জেলে, গবাদিপশু চরাতে যাওয়া কৃষক কিংবা কাঠ সংগ্রহকারীরা জানতেই পারছেন না, কোথায় পা ফেললে মৃত্যু অপেক্ষা করছে।

টেকনাফ ও হোয়াইক্যংয়ের সীমান্তবর্তী জনপদগুলোতে বসবাসরত মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দিনের বেলায়ও ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছেন তারা। কৃষিকাজ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, নাফ নদীতে মাছ ধরা এখন প্রাণঘাতী ঝুঁকি। অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে গ্রাম ছাড়ার কথাও ভাবছে। সীমান্তবাসীদের এই আতঙ্ক কেবল নিরাপত্তা সংকট নয়, বরং একটি মানবিক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে ঝুঁকিতে ফেলে এমন অস্ত্র ব্যবহারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। পাশাপাশি অটোয়া চুক্তিতে স্থলমাইন ব্যবহারের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সীমান্তের কাছে নির্বিচারে মাইন পুঁতে রাখা এবং তার প্রভাব যদি একটি নিরপেক্ষ দেশের ভূখণ্ডে পড়ে, তাহলে তা শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, বরং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নও তুলে ধরে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মাইন বিস্ফোরণের ঘটনাগুলো সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্যও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। সীমান্ত এলাকায় টহল জোরদার করা হলেও সংঘাত চলমান থাকায়- অনুপ্রবেশ ঠেকানো, সব জায়গায় মাইন শনাক্ত ও অপসারণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। সীমান্তের বিস্তীর্ণ দুর্গম এলাকা, পাহাড়, বন ও নদীঘেরা অঞ্চল এই কাজকে আরও জটিল করে তুলছে। ফলে স্থানীয়দের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশকে কূটনৈতিকভাবে আরও সক্রিয় হতে হবে। দ্বিপাক্ষিক পর্যায়ে মিয়ানমারের কাছে কঠোর প্রতিবাদ জানানো, পাশাপাশি জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে বিষয়টি অবহিত করা জরুরি হয়ে উঠেছে। নতুবা সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণের এই প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও প্রাণহানি ডেকে আনতে পারে। সীমান্তজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই নীরব মৃত্যুফাঁদ শুধু নিরাপত্তা ঝুঁকিই নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের নাগরিকদের জীবনের ওপর সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।


