আরাকান আর্মির রাজনৈতিক শাখা ইউনাইটেড লীগ অব আরাকান (ইউএলএ) যে অভিযোগ তুলেছে, বাংলাদেশের বর্ডার গার্ড (বিজিবি) না কি আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) ও রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনকে (আরএসও) সমর্থন দিচ্ছে- তা বিভ্রান্তিকর বলে জানিয়েছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি।

সোমবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দেওয়া এক বিবৃতিতে বিজিবি জানায়, আরসা বা আরএসও’র সঙ্গে তাদের কোনো ধরনের যোগাযোগ নেই। বরং এই সংগঠনগুলোকে বাংলাদেশের ভেতরে টিকে থাকতে না দেওয়ার জন্য ধারাবাহিকভাবে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

বিজিবির দাবি, শীর্ষ নেতা আতাউল্লাহ জুনুনিসহ সংগঠনের বেশ কয়েকজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এটাই প্রমাণ করে, সশস্ত্র রোহিঙ্গা সংগঠনগুলোকে বিজিবি মিত্র নয়, বরং বাংলাদেশের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে।

সীমান্তরক্ষী বাহিনী আরও জানায়, সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে যেকোনো অননুমোদিত সশস্ত্র ব্যক্তিকে উচ্ছেদ এবং তাদের কার্যকলাপ নির্মূল করার জন্য বিজিবি সবসময় প্রস্তুত এবং কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বিজিবি জানিয়েছে, আরসা বা আরএসও’র সাথে বিজিবির সংযোগের বিষয়ে ইউএলএলের অভিযোগ আসলে নিজেদের মানবাধিকার লঙ্ঘন, নির্যাতন ও অস্থিতিশীল কর্মকাণ্ড আড়াল করার কৌশল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই বাস্তবতা স্বীকার করে অপরাধীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে বিজিবি।

বিজিবি বলেছে, জাতীয় সীমান্ত সুরক্ষিত করা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখা এবং দশ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়ার বোঝা পরিচালনা করা তাদের স্পষ্ট দায়িত্ব। ২০২৩ সালের শেষের দিকে মিয়ানমারের যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে বিজিবি নাফ নদী ও সীমান্তবর্তী পাহাড়ে টহল জোরদার করেছে যাতে সহিংসতা ছড়িয়ে না পড়ে। ঘুমধুম ও বান্দরবান-কক্সবাজারজুড়ে এখন সর্বত্র সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছে। তারা সার্বক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিত করার জন্য ছয় ঘণ্টা শিফটে কাজ করছে। অস্ত্র ও সরঞ্জামসহ অতিরিক্ত সৈন্য ও টহল মোতায়েন রয়েছে যাতে চোরাকারবারি ও জঙ্গিরা প্রবেশের সুযোগ না পায়।

এতে বলা হয়, ইউএলএ যখন বিজিবির দিকে আঙুল তুলছে, তখন আরাকান আর্মি (এএ) নিজেই উত্তর মংডুতে গভীরতর সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে তাদের বাহিনীগুলোর মনোবল ভেঙে পড়েছে। মাদক ব্যবসা, লুণ্ঠিত সম্পদ নিয়ে বিরোধ এবং মানসিক ক্লান্তিতে যোদ্ধারা হতাশ হয়ে পড়েছে। নতুন সদস্য সংগ্রহে অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর মানুষকে যুক্ত করলেও ভাষাগত বাধা, ভূমি সম্পর্কে অজ্ঞতা ও যুদ্ধের অনিচ্ছা তাদের কার্যকারিতা কমিয়ে দিয়েছে। বুথিডং অঞ্চলের খাদ্যসংকট পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছে, যার ফলে বহু রোহিঙ্গা বাংলাদেশ সীমান্তে ঢোকার চেষ্টা করছে।

বিজিবি বলেছে, একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো- আরাকান আর্মির (এএ) একজন লেফটেন্যান্ট বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আত্মসমর্পণ করে বলে জানা গেছে- যা তাদের দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। আরাকান সেনাবাহিনীর নির্যাতন কেবল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ম্রো এবং তানচঙ্গ্যার মতো ক্ষুদ্র জাতিগত সংখ্যালঘুরাও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এমনকি রাখাইন সম্প্রদায়ের সদস্যরা যারা আরাকান আর্মিকে চাঁদাবাজির অর্থ দিতে অস্বীকার করে তারাও ভয়, সহিংসতা ও হয়রানির শিকার হয়। এই গোষ্ঠীগুলোর অনেকেই চাপ সহ্য করতে না পেরে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী আরও জানিয়েছে- বিজিবি ধারাবাহিকভাবে এআরএসএ বা আরএসও’র বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছে। তাদের চাঁদাবাজি নেটওয়ার্ক ভেঙে দিয়েছে এবং নাফ অঞ্চলে মাদক পাচার রোধ করেছে। গোয়েন্দা তথ্য নিশ্চিত করেছে যে, জঙ্গিরা বাংলাদেশের মাটি থেকে নয়, মিয়ানমার থেকে অনুপ্রবেশ করে। তাছাড়া, সীমান্তে আরাকান আর্মির পুঁতে রাখা ল্যান্ডমাইনগুলো এটিকে অবাধে বাংলাদেশ থেকে পরিচালিত হওয়ার বিষয়টি অবাস্তব করে তোলে। বিজিবি সর্বদা দেশের স্বার্থকে সমর্থন করে এবং মানবিক সুরক্ষা, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ ও সীমান্ত স্থিতিশীলতার উপর জোর দেয়।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিজিবি বলেছে, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের জন্য পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে যাতে তারা ন্যায়বিচার ও মর্যাদার সঙ্গে স্বদেশে ফিরে যেতে পারে। চরমপন্থীদের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে নয় বরং সতর্কতা, কূটনীতি ও মানবিক পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশের সীমান্ত সুরক্ষিত রাখবে বিজিবি।