মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ এখন বাংলাদেশি নিত্যপণ্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। রাখাইনের বন্দর শহর মংডু জান্তা সরকারের হাতছাড়া হওয়ার পর মিয়ানমারের রাজধানী ইয়াঙ্গুন এবং জেলা শহর আকিয়াবের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়ার পর সেখানে কৃত্রিম সংকট দেখা দিয়েছে। রাজ্যটির পশ্চিমাঞ্চলীয় (নাফনদীর পূর্বে) বিশাল এলাকা জুড়ে রয়েছে বাংলাদেশি মোবাইল নেটওয়ার্ক। সেখানে কেনাকাটায়ও চলছে বাংলাদেশি টাকা।
নাফনদীর এপার-ওপার চলছে মোবাইল বিকাশ এ লেনদেন। এ কারণে বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে নিত্যপণ্য পাচার বেড়ে গেছে। বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলার ৫ টি সীমান্ত উপজেলার সীমান্ত এলাকা দিয়ে দেদারসে পাচার হচ্ছে বাংলাদেশি পণ্য। এমনকি চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকার সাগর পথেও নৌযানে পাচার হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
খোঁজ-খবর নিয়ে জানা গেছে, মিয়ানমারের বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি কর্তৃক বন্দর শহর মংডু দখলে নেয়ার পর ক্ষুব্ধ জান্তা বাহিনী রাখাইনে সে দেশের পণ্য সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে আরাকানে নিত্যপণ্যের সংকট ক্রমশ বাড়ছে। চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশের দিকেই তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে আরাকান আর্মিকে। এ সংকট আরো বাড়তে পারে বলেও শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে সীমান্তের ওপারের বাসিন্দাদের তরফে।
সীমান্তে বাংলাদেশ অংশের লোকজন জানিয়েছে, ওপারে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপণ্যের দামও বেড়েছে। অতি মুনাফার লোভে পড়ে অসাধু লোকজন পণ্য পাচারে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এপার থেকে পাচার হচ্ছে না এমন কোন পণ্যই বাদ নেই। ওষুধ থেকে শুরু করে পানীয় জলের বোতল পর্যন্ত যাচ্ছে।
বিজিবির মাঠ পর্যায়ের সদস্যরাও রীতিমতো বিপাকে পড়েছেন। তারা সীমান্তের এদিক সামাল দিলে ওদিকে পাচার হয়-বিষয়টি এক প্রকার এরকম। সীমান্ত এলাকায় এ কারণে বিজিবির পাহারা দেখেই পাচারকারীরা পাচারের সুযোগ কাজে লাগায়।
নাফনদীর ওপারে আরাকানের মংডু এলাকায় বাংলাদেশি মোবাইল নেটওয়ার্ক থাকার কারণে ওপারের খবরাখবরও এখন প্রতিনিয়ত পাওয়া যাচ্ছে। সেখানকার দোকান পাটগুলোতে কেবল বিক্রি হয় বাংলাদেশি পণ্য।
গতকাল শুক্রবার সকালে মংডু এলাকা থেকে প্রাপ্ত কয়েকটি গ্রামীণ দোকানের চিত্রে এরকম দৃশ্যই দেখা যাচ্ছে। মংডু শহরের উত্তরে অন্তত ১০ কিলোমিটার এবং টেকনাফের হ্নীলা দমদমিয়া এলাকার নাফ নদীর চার কিলোমিটার পূর্বের বুড়া সিকদার পাড়ার একজন বাসিন্দা জানান, এককালের ধনে ধান্যে ভরা আরাকান এখন খাঁ খাঁ করছে।
সেখানে কেবল তরিতরকারি-সবজি মিলছে। চালের দামও খুব বেশি নয়। খালবিলে জাল ফেললেই মাছ পাওয়া যায়। কিন্তু রান্নার জন্য উপকরণের তীব্র অভাব। এক বোতল ৫ লিটারের সয়াবিন তেলের দাম বাংলাদেশি টাকায় আড়াই হাজার টাকা। যে পিঁয়াজ-রসুন সব সময় মংডু থেকে টেকনাফে আসত সেটিই এখন অত্যন্ত দামি পণ্য পরিণত হয়েছে ওপারে।
মংডু এলাকায় বাংলাদেশি নগদ টাকায় কেনা-বেচাসহ বিকাশে লেনদেন এখন সবচেয়ে সহজ হয়ে উঠেছে। সেখানকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, বিকাশ লেনদেনের মধ্যে বাংলাদেশি পণ্য সামগ্রীও পাচারের ঘটনা ঘটছে।
মংডু শহরের দখল নেওয়ার পর কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক নাফ নদীর বাংলাদেশ অংশসহ টেকনাফ উপকূলের সাগরে নৌযান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় পাচার কিছুটা বন্ধ ছিল। কিন্তু এখন নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার স্থল ও উখিয়া উপজেলার পালংখালী সহ টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের চোরাই পয়েন্টগুলো পাচারকাজে রমরমা হয়ে পড়েছে।
ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান একেএম জাহাঙ্গির আজিজ জানিয়েছেন-‘আমার এলাকা দিয়ে গত ক’দিন ধরে সবচেয়ে বেশি পণ্য পাচার হচ্ছে। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে তুমব্রু, নয়াপাড়া জিরো পয়েন্ট ও ঘুমধুম এলাকা দিয়ে প্রচুর পরিমাণ পণ্য পাচার হয়ে যাচ্ছে। এপারের ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গারা সীমান্তে এসে জড়ো হয়ে পাচারকারীদের শ্রমিক হিসেবে পণ্য পাচারে লিপ্ত রয়েছে। সেই সাথে রাতের আঁধারে ওপার থেকে রোহিঙ্গাদেরও অনুপ্রবেশ ঘটছে।
সীমান্তের স্থানীয় অসাধু লোকজন টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশে সহযোগিতা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি পাচার হয়ে যাচ্ছে সিমেন্ট, ইউরিয়া সার, ভোজ্য তেল, চাল-ডাল, তরিতরকারি, কাপড়চোপড় ও ঔষধসহ যাবতীয় পণ্য সামগ্রী।
গত ৯ ডিসেম্বর রাতে মিয়ানমার পাচারকালে কক্সবাজারের চকরিয়ায় ৪০ বস্তা সার উদ্ধার করেছে পুলিশ। চকরিয়া থেকে এ পরিমাণ সার মহেশখালী দ্বীপের উপকূল দিয়ে সাগর পথে মিয়ানমার পাচারের চেষ্টা করা হয়েছিল।
চকরিয়া থানার ওসি মনজুর কাদের ভুঁইয়া জানিয়েছেন, জব্দ করা সারের তালিকা তৈরি করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। অপরদিকে মিয়ানমার পাচারকালে ৩৫০ বস্তা বোঝাই একটি সিমেন্ট বোঝাই বোট মহেশখালীর মাতারবাড়ি এলাকার সাগরে ডুবে গেছে।
গত ১০ ডিসেম্বর (মঙ্গলবার) সিমেন্ট বোঝাই বোটের ৬ জন পাচারকারীকে উদ্ধার করা হয়েছে। কুতুবদিয়া থানার ওসি আরমান হোসেন জানিয়েছেন, উদ্ধার করা ৬ পাচারকারীর মধ্যে উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্পের ৩ জন রোহিঙ্গাও রয়েছেন। তারা স্থানীয় অপর ৩ পাচারকারীর সাথে মিলেমিশে কুতুবদিয়া দ্বীপের আলী আকবর ডেইল নৌঘাট থেকে ৩৫০ বস্তা সিমেন্ট বোঝাই করে সাগর পথে মিয়ানমার পাড়ি দিয়েছিল।
এ পরিমাণ সিমেন্ট কুতুবদিয়া দ্বীপের আলী আকবর ডেইল ঘাট দিয়ে নৌকা বোঝাই করা হয়। ডুবে যাওয়া বোটের উদ্ধারপ্রাপ্ত ৩ রোহিঙ্গাসহ ৬ পাচারকারী পুলিশের কাছে পাচারের কথা স্বীকার করেছে।

  • -পার্বত্য সময়