নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) প্রধান আতাউল্লাহকে। সোমবার (১৭ মার্চ) রাতে র‍্যাব-১১ একটি বিশেষ অভিযানে তাকেসহ তার সহযোগীদের আটক করে। মিয়ানমারের পাশাপাশি বাংলাদেশ পুলিশের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় থাকা এই সন্ত্রাসীর পুরো নাম আতাউল্লাহ, যিনি ‘আবু আমর জুনুনি’ নামেও পরিচিত।
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু কোনারপাড়া এলাকায় প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) এক কর্মকর্তা হত্যাকাণ্ডের মামলায় ৪৯ জন চিহ্নিত আসামির মধ্যে অন্যতম ছিলেন আতাউল্লাহ।
আতাউল্লাহ ও আরসার উত্থান
মিয়ানমারভিত্তিক বিদ্রোহী সংগঠন ‘হারাকাহ আল ইয়াকিন’ থেকে জন্ম নেওয়া সংগঠন ‘আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি’ (আরসা) রোহিঙ্গাদের মধ্যে আলোচিত ও বিতর্কিত। এর প্রধান আতাউল্লাহ ২০১৭ সালে এক বিতর্কিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দমন-পীড়ন উসকে দেন। এর ফলে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে হয়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলামের মতে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট আতাউল্লাহর নেতৃত্বে আরসা মিয়ানমারের পুলিশ চেকপোস্টে হামলা চালায়। এই ঘটনার পর মিয়ানমার সেনাবাহিনী সাধারণ রোহিঙ্গাদের ওপর ব্যাপক নিপীড়ন শুরু করে, যার ফলস্বরূপ তারা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। রোহিঙ্গাদের অনেকেই মনে করেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে আতাউল্লাহর গোপন যোগাযোগ ছিল এবং তিনিই রোহিঙ্গাদের দুর্দশার জন্য দায়ী।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’ জানায়, আরসা মূলত সৌদি আরবে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। মক্কায় বসবাসরত ২০ জন রোহিঙ্গা নেতা সংগঠনটির গোড়াপত্তন করেন। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতে তাদের নেটওয়ার্ক রয়েছে।
আতাউল্লাহর পরিচয় ও অতীত
আতাউল্লাহর সাংগঠনিক নাম ‘আবু আমর জুনুনি’। তার বাবা মিয়ানমারের মংডুর বাসিন্দা ছিলেন, পরে আশির দশকে পাকিস্তানের করাচিতে চলে যান, সেখানেই আতাউল্লাহর জন্ম। তবে তিনি বেড়ে উঠেছেন সৌদি আরবের মক্কায়, যেখানে তিনি মাদরাসায় পড়াশোনা করেন। সৌদি আরবে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের নিয়ে তিনি ‘ফেইথ মুভমেন্ট’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন।
২০১২ সালে আতাউল্লাহ সৌদি আরব থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে যান এবং সৌদি পাসপোর্ট ব্যবহার করে মিয়ানমারের রাখাইনে প্রবেশ করেন। সে বছরই ২৮ মে এক বৌদ্ধ নারীর বাড়িতে ডাকাতি ও হত্যার ঘটনা ঘটে। এর জেরে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় প্রাণ হারায় ৮০ জন, উদ্বাস্তু হয় এক লাখেরও বেশি মানুষ।
আরসার কার্যক্রম ও হামলা
রোহিঙ্গাদের এই সংকটকে পুঁজি করে পাকিস্তানি নাগরিক আবদুল কুদ্দুস বর্মির নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘হারাকাহ আল ইয়াকিন’, যার সামরিক কমান্ডার ছিলেন আতাউল্লাহ। ২০১৩ সালে সংগঠনটি আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করে এবং পরে এটি ‘আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি’ বা আরসা নামে পরিচিতি পায়।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের পুলিশ চেকপোস্টে হামলার ঘটনায় বিশ্ববাসীর নজরে আসে আরসা। মিয়ানমার সরকার দাবি করে, হামলাটি আতাউল্লাহর নির্দেশে পরিচালিত হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী ভয়াবহ দমন-পীড়ন চালায়, যার ফলে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।
আতাউল্লাহর সন্ত্রাসী কার্যক্রম ও গ্রেফতার
আতাউল্লাহ একসময় রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) সদস্য ছিলেন। তিনি আফগানিস্তান ও কাশ্মীরে যুদ্ধ করেছেন এবং হরকাতুল জিহাদ উজবেকিস্তানের সামরিক কমান্ডার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পাকিস্তান, উজবেকিস্তান, আফগানিস্তান, কাশ্মীর, সিরিয়া এবং বিভিন্ন আরব দেশের অর্থদাতাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে জানা যায়।
বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী তুমব্রু কোনারপাড়া এলাকায় শূন্যরেখায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়ে আতাউল্লাহ তার সংগঠনের ঘাঁটি গড়ে তোলে। সেখানে সুড়ঙ্গ নির্মাণ করে মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা চালাতো আরসার সদস্যরা। এমনকি সেখানে 'গোল্ডেন আরাকান' নামে একটি আধুনিক রেস্টুরেন্টও চালানো হতো।
২০২২ সালের ১৪ নভেম্বর বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে আরসার গুলিতে ডিজিএফআই কর্মকর্তা স্কোয়াড্রন লিডার রিজওয়ান রুশদী নিহত হন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর আদালতে ৪৯ জন আসামির বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। আদালত আতাউল্লাহসহ ৪৯ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলে বিভিন্ন সংস্থা অভিযান জোরদার করে।
অবশেষে, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে র‍্যাব-১১ আতাউল্লাহকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। তার গ্রেফতারের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের বিতর্কিত এই সন্ত্রাসী নেতা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়লেন, যা রোহিঙ্গা সংকটের প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি বলে মনে করা হচ্ছে।