বাংলাদেশের সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে চীন। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে ২৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর তথ্য তুলে ধরেছেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইসিং।
বুধবার (০৪ নভেম্বর) ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সেমিনারে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
‘ইতিহাস যেভাবে ভবিষ্যৎকে আলোকিত করে: বাংলাদেশ-চীন ‘পলিটিক্যাল পার্টিজ প্লাস’ গোলটেবিল বৈঠক ও বাংলাদেশ-চীন দলীয় ও রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা অধ্যয়ন কেন্দ্রের উদ্বোধন’ শীর্ষক এ সেমিনারের আয়োজন করে ঢাকায় চীনা দূতাবাস।
লিউ হাইসিং বলেন, রাজনৈতিক যোগাযোগ জোরদার, অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আরও গভীর করতে আগ্রহী চীন। দুই দেশের বন্ধুত্বকে অভিন্ন সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘ইতিহাসের এক নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমরা বাংলাদেশের সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে একযোগে কাজ করতে, বন্ধুত্ব এগিয়ে নিতে, ঐকমত্য গড়ে তুলতে এবং পারস্পরিক বিনিময় ও অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ আরও গভীর করতে প্রস্তুত।’
বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্কের অগ্রগতি তুলে ধরে চীনা নেতা বলেন, দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। চীন তার অর্থনীতিকে আরও উন্মুক্ত করার পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে উচ্চমানের পণ্য আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে।
বাংলাদেশকে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার উল্লেখ করে লিউ বলেন, চীনের সহায়তায় নির্মিত মহাসড়ক, সেতু ও টানেলসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখছে। ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনা হিসেবে তিনি মোংলা বন্দর শিল্পপার্ক ও তিস্তা নদী পুনরুদ্ধার উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন।
রাজনৈতিক সহযোগিতার বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল ও অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে শাসনব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন এবং দল গঠনের অভিজ্ঞতা বিনিময়ে আগ্রহী চীনের কমিউনিস্ট পার্টি। এ ক্ষেত্রে সিপিসির অভিজ্ঞতা ও নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের সঙ্গে ভাগ করে নিতে প্রস্তুত চীন।
লিউ আরও বলেন, দুই দেশের সহযোগিতা শুধু সরকারে-সরকারে সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে রাজনৈতিক দল, তরুণ প্রজন্ম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যেও বিস্তৃত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের সঙ্গে নিজের পারিবারিক সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করে তিনি জানান, প্রায় ৪৬ বছর আগে তাঁর বাবা বাংলাদেশে চীনের দ্বিতীয় রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় তিনি শৈশবে আড়াই বছর ঢাকায় ছিলেন। দীর্ঘ সময় পর বাংলাদেশে ফিরে পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হওয়ায় আবেগাপ্লুত হয়েছেন বলেও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরীসহ বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ নেতারা। এ ছাড়া পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ী নেতারাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে লিউ বলেন, ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, একতরফাবাদ ও আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে আন্তর্জাতিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ও চীনের একযোগে কাজ করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি যেভাবেই পরিবর্তিত হোক না কেন, চীন ও বাংলাদেশ সব সময় একে অপরের পাশে থাকবে এবং বিশ্বশান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে একসঙ্গে কাজ করবে।’
দুই দেশের জনগণের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব ভবিষ্যতেও আরও শক্তিশালী হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন চীনা এই নেতা।


