মামুন মজুমদার

 

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে এলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ইশতেহার প্রণয়নের ধুম পড়ে যায়। সাধারণত অর্থনীতি, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো জনপ্রিয় বিষয়গুলো ইশতেহারে প্রাধান্য পায়। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যুটি একদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার প্রশ্ন এবং অন্যদিকে ক্রমশ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির সমীকরণে যুক্ত হচ্ছে। তবে এখনও দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী অঙ্গীকারে যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি কেবল 'উন্নয়ন' বা 'শান্তি রক্ষা'র গৎবাঁধা কিছু শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। অথচ পার্বত্য চট্টগ্রাম শুধু একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়; এটি জাতীয় সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং জাতিগত সংহতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির আড়াই দশক পেরিয়ে গেলেও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্ক রয়ে গেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে এই চুক্তি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার থাকা যেমন জরুরি, তেমনি চুক্তির যে ধারাগুলো সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী বলে মনে করা হয়, সেগুলোর যৌক্তিক পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন। ইশতেহারে স্পষ্ট উল্লেখ থাকা উচিত যে, পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় কোনো বিশেষ গোষ্ঠী নয়, বরং দেশের সংবিধান ও সকল নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে।

বিশেষ করে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ডিজিটাল ভূমি জরিপের মাধ্যমে খাস জমি, সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও রাষ্ট্রায়ত্ত জমি সুনির্দিষ্ট করার সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ইশতেহারে থাকা চাই। পাশাপাশি আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদগুলোতে দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়া গণতান্ত্রিক চর্চাকে ব্যাহত করছে। নিয়মিত নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং অ-উপজাতীয় (বাঙালি) ও উপজাতীয় অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের যথাযথভাবে শনাক্ত করে তাদের পুনর্বাসনের একটি স্বচ্ছ রোডম্যাপ ভোটারদের সামনে উপস্থাপন করা এখন সময়ের দাবি।

পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়নের সমবণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে। চাকরি, শিক্ষা, প্রশাসনিক পদায়ন এবং ভূমি কেনাবেচার ক্ষেত্রে যে আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা রয়েছে, তা নিরসনের প্রতিশ্রুতি ইশতেহারে থাকতে হবে। উন্নয়নের সংজ্ঞায় কেবল 'উপজাতীয়' বা 'বাঙালি' তকমা না রেখে, 'প্রকৃত পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী'কে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি গ্রহণ করতে হবে। যখন পাহাড়ের প্রতিটি মানুষ- সে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর হোক বা বাঙালির- রাষ্ট্রের কাছ থেকে সমান সুযোগ পাবে, তখনই সামাজিক বিভাজন কমবে এবং বিচ্ছিন্নতাবাদের পথ রুদ্ধ হবে।

পাহাড়ের সাধারণ মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হলো আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর চাঁদাবাজি, অপহরণ এবং আধিপত্য বিস্তার। রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের ইশতেহারে এই সন্ত্রাসী দলগুলোর বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতি ঘোষণা করতে হবে। সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি হওয়া সাধারণ মানুষকে রক্ষা, অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান বন্ধ এবং নারী ও শিশুদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের মতো অমানবিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার থাকতে হবে। এছাড়া, ইদানীং পাহাড়ে জঙ্গি সংগঠনের উপস্থিতির যে খবর পাওয়া যায়, তা দমনে সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করার বিষয়টি ইশতেহারে গুরুত্বের সাথে আসা উচিত।

পার্বত্য চট্টগ্রামে এনজিওগুলোর ভূমিকা নিয়ে নানাবিধ প্রশ্ন রয়েছে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের আড়ালে অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তা বা রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতায় ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার হওয়া উচিত এনজিও কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। সন্দেহজনক ও সার্বভৌমত্ববিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত এনজিওগুলোর কার্যক্রম বন্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।

একই সঙ্গে, পার্বত্য ইস্যুটিকে আন্তর্জাতিক মহলে সঠিকভাবে তুলে ধরার কৌশল ইশতেহারে থাকা জরুরি। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের মাধ্যমে নিয়মিত সংলাপের ব্যবস্থা করতে হবে। মিয়ানমার সীমান্ত পরিস্থিতি এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা যাতে একে অপরের পরিপূরক সংকটে রূপ না নেয়, সে জন্য একটি দূরদর্শী ও সমন্বিত পররাষ্ট্রনীতির প্রতিশ্রুতি ভোটাররা প্রত্যাশা করে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যুটিকে উপেক্ষা করার বা ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন কেবল একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। রাজনৈতিক দলগুলো যদি তাদের ইশতেহারে এই বিষয়গুলোকে সময়নির্ধারিত ও বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনাসহ অন্তর্ভুক্ত করে, তবেই তা হবে প্রকৃত রাষ্ট্রনায়কোচিত পদক্ষেপ। একটি স্থিতিশীল, নিরাপদ ও ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে একটি বলিষ্ঠ 'রাষ্ট্রকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি' গ্রহণ করা এখন অনিবার্য।

 

লেখক: দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতি ও নিরাপত্তা বিষয়ক বিশ্লেষক