অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশ- মিয়ানমার সীমান্তে বর্তমানে মিয়ানমারের সরকারি সেনাবাহিনীর কোনো উপস্থিতি নেই। পুরো সীমান্ত এলাকা কার্যত আরাকান আর্মির দখলে রয়েছে, আর এ কারণেই বাংলাদেশ নানামুখী সমস্যার মুখে পড়ছে।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) সকালে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ১০৪তম রিক্রুটিং প্যারেডের সমাপনী অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, মিয়ানমার একটি বৈধ রাষ্ট্র। আমাদের যোগাযোগ রাষ্ট্র হিসেবে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো- বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মিয়ানমার অংশে এখন মিয়ানমার আর্মি নেই, সেখানে আরাকান আর্মি অবস্থান করছে। সীমান্তের পুরো অংশই তাদের নিয়ন্ত্রণে। এ কারণেই সীমান্তে বাংলাদেশকে নিয়মিত সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ সরকার আরাকান আর্মিকে কোনোভাবেই বৈধতা দেয়নি। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কখনোই কোনো নন-স্টেট অ্যাক্টরের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ করতে পারে না। “সীমান্তে কোনো সমস্যা হলে আমরা মিয়ানমার সরকারের কাছেই প্রতিবাদ জানাই। আরাকান আর্মি নানা উপায়ে সীমান্তে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে, যা আমাদের জন্য উদ্বেগের বিষয়,” যোগ করেন তিনি।
টেকনাফ সীমান্তে আরাকান আর্মির গুলিতে শিশু হুজাইফা আফনান গুরুতর আহত হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, কিছুদিন আগে আমাদের একটি ছোট শিশু মর্টার ও গুলির আঘাতে মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে। তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়েছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘর্ষের সময় দু-একটি গুলি বাংলাদেশ অংশে এসে পড়ে। আমরা এ ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়েছি। ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনা না ঘটে, সে জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, ১২ জানুয়ারি ২০২৬ মিয়ানমার দিক থেকে ছোড়া গুলিতে টেকনাফের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী হুজাইফা আফনান গুরুতর আহত হয়। ঘটনার পরদিন, ১৪ জানুয়ারি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত কিয়াউ সোয়ে মো-কে তলব করে গভীর উদ্বেগ জানায়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, তলবের সময় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্ররোচিত গুলি চালানো আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং এটি দুই দেশের সুষ্ঠু প্রতিবেশী সম্পর্কের পরিপন্থী। বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমারকে এ ধরনের আন্তসীমান্ত গোলাগুলির পুনরাবৃত্তি বন্ধে পূর্ণ দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানায় এবং প্রয়োজনীয় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি তোলে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সে দেশের কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে যা-ই ঘটুক না কেন, তার প্রভাব যেন কোনোভাবেই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকায় না পড়ে—এ বিষয়টি নিশ্চিত করা মিয়ানমারের দায়িত্ব।
তলবের সময় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত কিয়াউ সোয়ে মো আহত শিশু হুজাইফা আফনান ও তার পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা প্রকাশ করেন এবং জানান, এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে মিয়ানমার সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
উল্লেখ্য, ১২ জানুয়ারি রোববার সকাল ৯টার দিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে ছোড়া গুলিতে টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের তেচ্ছিব্রিজ সীমান্ত এলাকার শিশু হুজাইফা গুলিবিদ্ধ হয়। প্রথমে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তার অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে এখনো সে সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন।
এদিকে সীমান্তে গোলাগুলিতে বাংলাদেশি নাগরিক আহত হওয়ার প্রতিবাদে কক্সবাজার–টেকনাফ সড়কে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে স্থানীয় জনগণ। তারা স্কুলছাত্রী হুজাইফার গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিচারের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী এলাকায় জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ও স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
স্থানীয়দের হুঁশিয়ারি, বাংলাদেশ–মিয়ানমার সীমান্তে গোলাগুলি ও সহিংসতা বন্ধে দ্রুত দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়া হলে টেকনাফবাসী আরও বৃহত্তর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে।


