দেশজুড়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আবারও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। বছরের প্রথম ১০ মাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৭০ হাজার ছাড়িয়েছে, মৃত্যু হয়েছে ২৭৮ জনের। শুধু অক্টোবর মাসেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২২ হাজার ৫২০ জন রোগী—যা সেপ্টেম্বরে ভর্তি হওয়া ১৫ হাজার ৮৬৬ জনের তুলনায় ৪২ শতাংশ বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, মশা দমনে অনিয়ম এবং জনসচেতনতার ঘাটতি—এই চার কারণে ডেঙ্গুর প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে। রাজধানীসহ সারা দেশে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে সমন্বয়ের অভাবও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় (শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৫১ জন ডেঙ্গু রোগী। এর মধ্যে ঢাকায় ৩৫৭ জন এবং ঢাকার বাইরে ২৯৪ জন। যদিও এই সময়ে নতুন কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, “ডেঙ্গু মোকাবিলায় কোনো জায়গাতেই কার্যকর সমন্বয় নেই। স্থানীয় সরকার মশা দমনে ব্যর্থ, স্বাস্থ্য বিভাগ চিকিৎসা দিচ্ছে শুধু হাসপাতালে, আর জনসচেতনতা তৈরিতে কেউ নেতৃত্ব দিচ্ছে না। এভাবে চললে আরও ২০–৩০ বছরেও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।”

তিনি আরও বলেন, “শহর ও গ্রামে একসঙ্গে অভিযান চালাতে হবে। নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে থেমে থেমে বৃষ্টি হলে শীতকালেও সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে যাবে।”

কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবীরুল বাশার জানান, সাধারণত নভেম্বরের দিকে ডেঙ্গু কমে যায়। কিন্তু এ বছর এখনও বিভিন্ন এলাকায় এডিস মশার ঘনত্ব সংক্রমণের উপযোগী পর্যায়ে রয়েছে। “জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে মৌসুম দীর্ঘ হচ্ছে। কার্যকর মশা নিয়ন্ত্রণ ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন,” বলেন তিনি।

তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর মাসে ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে—৮০ জন। সেপ্টেম্বরে মারা গেছেন ৭৬ জন। জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় প্রতি মাসেই সংক্রমণ বেড়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি ডেঙ্গু মৌসুমের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা

চট্টগ্রাম বিভাগে ডেঙ্গুর বিস্তার সবচেয়ে বেশি। সিভিল সার্জন কার্যালয় বলছে, জেলার ১৫ উপজেলার মধ্যে পাঁচটিকে উচ্চঝুঁকির উপজেলা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে—সীতাকুণ্ড, বাঁশখালী, আনোয়ারা, লোহাগাড়া ও কর্ণফুলী।
শুধু সীতাকুণ্ডেই আক্রান্ত ৬৯৭ জন, বাঁশখালীতে ১৯৩, আনোয়ারায় ১৩০, লোহাগাড়ায় ১১১ এবং কর্ণফুলীতে ১০৪ জন। অক্টোবর মাসেই চট্টগ্রামে রেকর্ড ৯৮২ জন আক্রান্ত হয়েছেন, যা চলতি বছরের এক মাসে সর্বোচ্চ।

চট্টগ্রাম নগরের বাসিন্দাদের অভিযোগ, মশকনিধন কার্যক্রম প্রায় নেই বললেই চলে। অনেক এলাকায় মাসের পর মাস ওষুধ ছিটানো হয় না। সীতাকুণ্ডের বাসিন্দা মো. এসকান্দার হোসেন বলেন, “দিনেও মশার কামড়ে ঘরে থাকা যায় না। শিশুদের নিয়ে আতঙ্কে আছি।”

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “আমরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও মশকনিধন কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দিয়েছি। তবে অনেক এলাকায় তা সঠিকভাবে হচ্ছে না। পাশাপাশি মানুষকেও সচেতন হতে হবে, কারণ অনেকে এখনও ঘরের আশপাশে জমে থাকা পানির ঝুঁকি বোঝেন না।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু এখন আর মৌসুমি নয়, বরং সারা বছরের জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দুর্বল মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে আগামী বছরগুলোতেও সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা রয়ে গেছে।