দেশের অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয়ের অন্যতম প্রধান উৎস কাপ্তাই হ্রদে চলতি মৌসুমে ছোট প্রজাতির মাছ, বিশেষ করে কাচকি ও চাপিলার বাম্পার ফলন হয়েছে। সরকারের বহুমুখী সংরক্ষণমূলক উদ্যোগ, অভয়াশ্রম রক্ষণাবেক্ষণ এবং হ্রদ ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারির ফলে এই সুস্বাদু মাছ দুটির উৎপাদন কয়েক গুণ বেড়েছে। এর ফলে পাহাড়ের অর্থনীতিতে যেমন গতি সঞ্চার হয়েছে, তেমনি সরকারি রাজস্ব আদায়েও তৈরি হয়েছে নতুন রেকর্ড।

প্রায় ৭২৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের কাপ্তাই হ্রদের মৎস্য সম্পদের ওপর খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার অন্তত ৬ হাজার জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ী সরাসরি নির্ভরশীল। স্থানীয় বাজারে অবতরণকৃত মাছের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঘাটে প্রতিদিন যে পরিমাণ মাছ আসছে, তার প্রায় ৯৫ শতাংশই কাচকি ও চাপিলা। রূপালি রঙের এই ছোট মাছগুলো আকারে ক্ষুদ্র হলেও স্বাদে অনন্য হওয়ায় সারা দেশেই এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

মহালছড়ি মৎস্য অবতরণ ঘাটে কর্মরত মৎস্যজীবী মো. রাসেল ও ইলিয়াস হোসেন জানান, এ বছর হ্রদে মাছের উপস্থিতি গত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি। তারা বলেন, "আমাদের জীবিকা মূলত এই কাচকি ও চাপিলার ওপরই টিকে আছে। এই মাছে কোনো ভেজাল নেই এবং স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বরফজাত করে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এসব মাছ পাঠানো হচ্ছে।"

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সাধারণত অক্টোবর-নভেম্বর মাসে মাছের আকার কিছুটা ছোট থাকলেও ডিসেম্বরের শুরু থেকে পূর্ণাঙ্গ আকার ধারণ করে। মহালছড়ি মৎস্য সমবায় সমিতির সিনিয়র সহ-সভাপতি মো. আবুল খায়ের বলেন, "ডিসেম্বর থেকে মাছের আকার বড় হওয়ায় বাজারে এর ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে। এতে জেলে ও ব্যবসায়ী উভয় পক্ষই লাভবান হচ্ছে।"

মাছের এই বিপুল বংশবিস্তারের পেছনে বৈজ্ঞানিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাকে মূল কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএফডিসি) মহালছড়ি উপকেন্দ্রের তথ্যমতে, প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ রাখা এবং অভয়াশ্রমগুলোতে নিয়মিত টহল দেওয়ায় মাছ নির্বিঘ্নে বড় হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।

মহালছড়ি উপকেন্দ্র প্রধান মো. নাসরুল্লাহ জানান, "প্রজননের অনুকূল পরিবেশ এবং হ্রদে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক খাদ্য থাকায় ছোট মাছ দ্রুত বংশবিস্তার করতে পেরেছে। অবৈধ জালের ব্যবহার বন্ধে আমরা বছরব্যাপী বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছি। চলতি বছরের নভেম্বর মাস পর্যন্ত কেবল মহালছড়ি উপকেন্দ্রেই ৫০৮ মেট্রিক টন মাছ আহরিত হয়েছে, যা থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় হয়েছে ১ কোটি ১১ লক্ষ টাকা।"

মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কাপ্তাই হ্রদে এই কাচকি ও চাপিলার উৎপাদন বৃদ্ধি কেবল একটি আঞ্চলিক সাফল্য নয়, এটি জাতীয়ভাবে আমিষের চাহিদা পূরণেও বড় ভূমিকা রাখছে। যদি কারেন্ট জাল ও ঘের জালের মতো ক্ষতিকর সরঞ্জামের বিরুদ্ধে এই কঠোর অবস্থান অব্যাহত রাখা যায়, তবে ভবিষ্যতে এই রাজস্ব ও উৎপাদন আরও কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব।

পার্বত্য চট্টগ্রামের এই প্রাকৃতিক সম্পদকে কেন্দ্র করে স্থানীয় জেলেদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বিএফডিসির এই আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনা একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।