বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তনের প্রচেষ্টা জোরদার করতে একটি নেতৃত্ব পরিষদ গঠন করেছেন। তাদের আশা, এই পরিষদ শিবিরগুলোর ভেতরে সংগঠিত প্রতিনিধিত্ব গড়ে তুলবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রোহিঙ্গাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দাবিকে নতুন করে সামনে আনবে।

কক্সবাজারে প্রায় ৮ হাজার একর এলাকায় বিস্তৃত শরণার্থী শিবিরগুলোতে বর্তমানে প্রায় ১৭ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের জান্তা বাহিনীর সহিংস অভিযানের মুখে তারা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। জাতিসংঘের আদালতে ওই অভিযানকে কেন্দ্র করে গণহত্যার অভিযোগে তদন্ত চলছে।

আট বছর আগে গঠিত ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিংয়া (ইউসিআর) সম্প্রতি প্রথমবারের মতো নির্বাচন আয়োজন করে। এতে ৩৩টি শরণার্থী শিবির থেকে তিন হাজারের বেশি রোহিঙ্গা ভোট দেন। নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নির্বাহী কমিটি ও পাঁচজন আবর্তনকারী সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন, যারা মানবাধিকার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

শিবিরে আয়োজিত এক সমাবেশে ইউসিআর সভাপতি মোহাম্মদ সাঈদ উল্লাহ বলেন, রোহিঙ্গারা কখনোই সেই সহিংসতা ভুলবে না, যা তাদের নিজ ভূমি ছাড়তে বাধ্য করেছে।

তিনি বলেন, আমরা আমাদের বাবা-মায়ের কবর রেখে এসেছি। পথে আমাদের নারীরা নির্যাতিত হয়ে নিহত হয়েছেন, অনেকে সমুদ্রে ডুবে প্রাণ হারিয়েছেন। এই ইতিহাস আমরা ভুলতে পারি না।

তিনি আরও বলেন, আমাদের অবশ্যই নিজেদের বাড়ি ফেরার জন্য প্রস্তুত হতে হবে।

অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যে এই নতুন পরিষদ অনেক শরণার্থীর কাছে আশার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

৩৭ বছর বয়সী শরণার্থী খায়রুল ইসলাম বলেন, তারা আমাদের ঘরে ফেরানোর জন্য কাজ করছে। এই সংকীর্ণ ঘরে আমরা শ্বাস নিতে পারি না। পুরো পরিবার একটি মাত্র ঘরে থাকি।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, এখানে গরম অসহ্য। মিয়ানমারে আমাদের সিলিং ফ্যানের দরকারই হতো না। গ্রীষ্মে বড় গাছের ছায়ায় বসতাম।

আলোচনার টেবিলে আসনের দাবি

এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইউসিআর সভাপতি সাঈদ উল্লাহ বলেন, ইউসিআর চায় আলোচনার টেবিলে রোহিঙ্গাদের কণ্ঠস্বর হিসেবে জায়গা করে নিতে।

এর আগেও রোহিঙ্গাদের সংগঠিত করার নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০১৭ সালের পর আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসসহ কয়েকটি সংগঠন গড়ে ওঠে। সেসব উদ্যোগের অন্যতম নেতা মহিব উল্লাহ ২০২১ সালে নিহত হন।

সাঈদ উল্লাহ বলেন, কিছু সংবাদমাধ্যম আমাদের ভুলভাবে তুলে ধরেছিল, যেন আমরা বাংলাদেশে স্থায়ী হতে চাই। অনেক সংগঠককে আটক করা হয়। সবচেয়ে বড় ধাক্কা ছিল মহিব উল্লাহর হত্যাকাণ্ড।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিবিরের ভেতরে নতুন করে আস্থা তৈরি হচ্ছে।

বুথিডং থেকে পালিয়ে আসা ১৮ বছর বয়সী মোশাররফ বলেন, আমরা অবশ্যই বাড়ি ফিরতে চাই। ইউসিআর উন্নত শিক্ষার জন্য আলোচনা করবে। নিজেদের সংগঠিত করতে পারলে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় করা সম্ভব হবে।

নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন

সাম্প্রতিক সময়ে শিবিরের ভেতরে স্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে ইউসিআরের দ্বারস্থ হচ্ছেন অনেক শরণার্থী- যা সংগঠনটির প্রতি আস্থার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এক সকালে ইউসিআর কার্যালয়ের বাইরে অভিযোগ নিয়ে অপেক্ষায় থাকা এক ডজনের বেশি শরণার্থীকে দেখতে পান এএফপির এক প্রতিবেদক। কেউ নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন, কেউ আবার পালানোর সময় স্বর্ণালংকার হারানোর কথা জানিয়েছেন।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই কাউন্সিল সত্যিকার অর্থে রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে কি না- তা এখনো অনিশ্চিত।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সিনিয়র কনসালট্যান্ট থমাস কিন বলেন, ইউসিআরের নির্বাচন প্রক্রিয়া কর্তৃপক্ষের ঘনিষ্ঠ নজরদারিতে পরিচালিত হয়েছে বলেই মনে হয়।

তার মতে, ভবিষ্যতে এই পরিষদ কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে-সেটিই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।