ভাসানচরের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বাংলাদেশের ওপর কার্যত দায় চাপিয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ফোর্টিফাই রাইটস। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট উপেক্ষা করে বাংলাদেশকে একতরফাভাবে দোষারোপ করা অন্যায় ও বিভ্রান্তিকর।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ফোর্টিফাই রাইটস দাবি করে, বাংলাদেশ সরকারকে অবিলম্বে ভাসানচরের রোহিঙ্গা শিবির বন্ধ করতে হবে এবং সেখানে থাকা রোহিঙ্গাদের ‘নির্বিচারে আটক’ রাখা বন্ধ করা উচিত।
সংস্থাটির দাবি, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে প্রত্যন্ত দ্বীপে রাখা হয়েছে, যা বাংলাদেশের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।
তবে বাংলাদেশ সরকার বরাবরই স্পষ্ট করে বলে আসছে, তারা এই জনগোষ্ঠীকে ‘শরণার্থী’ নয়, বরং ‘জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিক’ হিসেবে বিবেচনা করে। মানবিক বিবেচনায় এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আহ্বানে সাড়া দিয়েই বাংলাদেশ বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে সাময়িক আশ্রয় দিয়েছে।
শিক্ষক ও গবেষক মঈনুল ইসলাম বলেন, বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ ও সীমিত সম্পদের দেশ হয়েও বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে নজিরবিহীন মানবিক উদারতা দেখিয়েছে। তবে একই সঙ্গে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা, স্থানীয় জনস্বার্থ এবং সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব- যা ফোর্টিফাই রাইটসের প্রতিবেদনে পুরোপুরি উপেক্ষিত।
ফোর্টিফাই রাইটসের প্রতিবেদনে জাতীয় নির্বাচনের পর বাংলাদেশের পরবর্তী সরকারের প্রতি ভাসানচর শিবির স্থায়ীভাবে বন্ধ, রোহিঙ্গাদের চলাচলের স্বাধীনতা, জীবিকার সুযোগ এবং ‘মর্যাদা’ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
সংস্থাটির পরিচালক জন কোয়েনলি বলেন, “শরণার্থী হওয়া কোনো অপরাধ নয়। ভাসানচর বাস্তবে একটি দণ্ডিত উপনিবেশের মতো কাজ করছে।”
মঈনুল ইসলামের মতে, বাংলাদেশ পূর্বে আসা অনেক রোহিঙ্গাকে শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তারা স্বাধীনভাবে চলাফেরা করছে, বিভিন্নভাবে জীবিকা উপার্জন করছে। কিন্তু ২০১৭ সালে আসা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ বলছে ‘জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিক’। তারা শরণার্থীর অধিকার পাবে কোন আইনে?
তিনি বলেন, ভাসানচর প্রকল্পটি মূলত কক্সবাজারের অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ কমানো, নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং শরণার্থীদের তুলনামূলকভাবে উন্নত আবাসন ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার একটি বাস্তবসম্মত উদ্যোগ। সেখানে খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও অবকাঠামোগত সহায়তা আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখেই নিশ্চিত করা হয়েছে।
এই গবেষক আরও বলেন, রোহিঙ্গাদের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও তদারকির দায়িত্ব এককভাবে বাংলাদেশের ওপর বর্তায় না। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এ বিষয়ে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত এবং দায়িত্বশীল অংশীদার।
বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি ও রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের বাস্তব উদ্যোগের বদলে বাংলাদেশকে অভিযুক্ত করা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রাজনীতির একটি পরিচিত কৌশল- যা সংকটের মূল সমস্যাকে আড়াল করে।


