২০১৭ সালের আগস্ট। পৃথিবীর চোখ বিস্ময়ে স্থির হয়ে গিয়েছিল রাখাইন রাজ্যের আগুনে। গ্রাম পুড়ছে, মানুষ পালাচ্ছে, শিশু কাঁদছে, নারীরা লাঞ্ছিত হচ্ছে। মিয়ানমারের সেনারা রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করে প্রায় সাত লাখ পঞ্চাশ হাজার রোহিঙ্গাকে ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে ছিটকে দিয়েছে সীমান্তের ওপারে। কক্সবাজারের পাহাড়ি উপত্যকা, যা আগে ছিল সমুদ্রপাড়ের নিস্তব্ধ জনপদ, মুহূর্তেই বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী ক্যাম্পে রূপান্তরিত হলো।
মিয়ানমার সরকার তখন বলেছিল, এগুলো নাকি অতিরঞ্জিত গল্প, ‘অসত্য তথ্য’। অং সান সু চি—নোবেলজয়ী সেই মানবাধিকারের প্রতীক—বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে সহিংসতাকে ‘কাকতালীয়’ বলে চালিয়ে দিয়েছিলেন। অথচ সেই আগুনে পোড়া ঘরের ধ্বংসাবশেষ, নিহত মানুষের কবর, অসংখ্য নির্যাতিত নারীর সাক্ষ্য অন্য এক ইতিহাস লিখছিল।
ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক গবেষণা আমাদের সামনে নতুন প্রমাণ হাজির করেছে। অর্থনীতিবিদ মুশফিক মোবারক ও তার সহকর্মীরা দেখিয়েছেন—এটা কেবল জাতিগত বিদ্বেষ বা হঠাৎ কোনো উসকানির ফল নয়। রোহিঙ্গাদের ওপর সহিংসতা ছিল পরিকল্পিত, কাঠামোবদ্ধ এবং অর্থনৈতিক স্বার্থনির্ভর।
ধানভিত্তিক অর্থনীতির মিয়ানমারে জমি সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। গবেষকরা উপগ্রহ চিত্র, বাজারমূল্যের ওঠানামা ও সংঘর্ষ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ধানের দাম যত বাড়ে, ততই রাখাইনের উর্বর অঞ্চলে সহিংসতা বেড়ে যায়। রোহিঙ্গাদের গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া, গবাদিপশু লুট করা, জমি দখল করা—এসব নিছক ‘অরাজকতা’ ছিল না; বরং ছিল রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় জমি দখলের কৌশল।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো— অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘর্ষ হলে সরকার সীমিত পাল্টা হামলা চালালেও রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে প্রতিটি ঘটনায় ছয়গুণ বেশি হামলা চালানো হয়েছে। এটাই প্রমাণ করে, নিপীড়ন ছিল অনুপাতহীন, পূর্বপরিকল্পিত এবং জাতিগত নিধনের সমার্থক।
আজ কক্সবাজারে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা আটকে আছেন। আট বছর পেরিয়ে গেলেও প্রত্যাবাসনের কোনো কার্যকর অগ্রগতি হয়নি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চোখে সংকট এখন ‘ক্লান্তির পর্যায়ে’। সহায়তা কমছে, দাতা সংস্থাগুলো দ্বিধান্বিত, অথচ ক্যাম্পের ভেতরে জন্ম নিচ্ছে নতুন প্রজন্ম—যাদের জন্মসনদ নেই, ভবিষ্যৎ নেই, কিন্তু হতাশা ও ক্ষোভ আছে।
বাংলাদেশ শুরুতে মানবতার দায় থেকে আশ্রয় দিয়েছিল। কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছে, অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ তত বেড়ে যাচ্ছে। স্থানীয়দের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, শ্রমবাজারে অস্থিরতা, পরিবেশের ক্ষতি—সব মিলিয়ে সংকট এখন বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে রূপ নিয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট আজ আর কেবল মানবিক সমস্যা নয়; এটি আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। যুক্তরাষ্ট্রের Burma Act, চীন-ভারতের কৌশলগত প্রতিযোগিতা, আরাকান আর্মির উত্থান—সবকিছু মিলে এই সংকট এখন বৈশ্বিক স্বার্থের মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছে।
মিয়ানমার সামরিক জান্তা সংকটকে ব্যবহার করছে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার অস্ত্র হিসেবে। তারা জানে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রাজনৈতিক ভারসাম্যের কারণে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নেবে না। অন্যদিকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা পরিণত হচ্ছে আঞ্চলিক কূটনীতির বলির পাঁঠায়।
প্রশ্ন হলো—এখান থেকে উত্তরণের পথ কোথায়?
প্রথমত, রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু মানবিক ইস্যু নয়, বরং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ইস্যুতে রূপান্তর করতে হবে। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মতো প্রমাণ আন্তর্জাতিক আদালতে ব্যবহার করে গণহত্যার দায় স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশকে এককভাবে নয়, বরং বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক জোট গড়ে তুলতে হবে। দক্ষিণ এশিয়া ও আসিয়ানের দেশগুলোকে চাপের মুখে ফেলতে না পারলে সংকট অমীমাংসিতই থেকে যাবে।
তৃতীয়ত, ক্যাম্পভিত্তিক জীবনকে মানবিক মর্যাদার সঙ্গে টিকিয়ে রাখতে আন্তর্জাতিক তহবিল নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় হতাশ তরুণ প্রজন্ম সহজেই উগ্রবাদী নেটওয়ার্কের শিকার হয়ে পড়বে।
রোহিঙ্গা সংকটের মূলে রয়েছে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পিত নিপীড়ন, জমি দখলের অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির কূটিল হিসাব। বাংলাদেশ মানবতার দায়ে আশ্রয় দিয়েছে, কিন্তু এই বোঝা বহন করা আর সম্ভব নয়। সময় এসেছে বিশ্বকে মনে করিয়ে দেওয়ার—রোহিঙ্গা সংকট শুধু কক্সবাজারের পাহাড়ের সমস্যা নয়, এটি বৈশ্বিক মানবাধিকার ব্যবস্থার এক বিরাট পরীক্ষাক্ষেত্র।
যদি এই পরীক্ষায় বিশ্ব ব্যর্থ হয়, তবে এর পরিণতি কেবল রোহিঙ্গাদের নয়, সমগ্র অঞ্চলের জন্য ভয়াবহ হবে।
-রিয়াজুল ইসলাম, গণমাধ্যমকর্মী


