দীর্ঘ দুই দশকের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটাতে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ঐতিহাসিক পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেছিল । তিন পার্বত্য জেলায় শান্তির সুবাতাস ফেরানো, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের যে নব দিগন্ত এই চুক্তির মাধ্যমে উন্মোচিত হয়েছিল, তা আজ, ২৭ বছর পরেও অধরাই রয়ে গেছে। পাহাড় এখনও অশান্ত- খুন, অপহরণ, অবৈধ অস্ত্রের মহড়া এবং চাঁদাবাজির মতো সহিংস কর্মকাণ্ড চলছেই, যার সম্পূর্ণ দায়ভার জেএসএস এবং তাদের থেকে বিভক্ত সশস্ত্র উপদলগুলির উপর বর্তায় ।
পার্বত্য অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে চলা সশস্ত্র সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধানে সরকার ১৯৯৭ সালে চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং সশস্ত্র সদস্যদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা। চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন তুলেছেন জেএসএস নেতৃবৃন্দ-সহ সুশীল সমাজের অনেকেই। জাতিসংঘের আদিবাসী-বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের ২৩তম অধিবেশনে বাংলাদেশ সরকার বাস্তবায়নের অগ্রগতি তুলে ধরে জানিয়েছেন যে, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এর ধারাগুলি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। মোট ৭২টি ধারার মধ্যে ইতোমধ্যে ৬৫টি সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয়েছে, ৩টি আংশিকভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে এবং ৪টি ধারা বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।
চুক্তির প্রধান শর্ত হিসেবে জেএসএস সভাপতি সন্তু লারমাকে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদাসহ আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে অধিষ্ঠিত করা হয়েছে । এছাড়া, ভারত প্রত্যাগত ১২,২২৩টি শরণার্থী পরিবারকে সফলভাবে পুনর্বাসন করা হয়েছে এবং জনগণের আস্থা বাড়াতে একটি ব্রিগেডসহ প্রায় ২৪১টি নিরাপত্তা ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে । সবচেয়ে জটিল সমস্যা ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সরকার উপজাতি নেতাদের বিরোধিতার পরও রাজনৈতিক ছাড় দিয়ে ২০১৬ সালে ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন সংশোধন করেছে । চুক্তির পর এই অঞ্চলে ৩ হাজার ৪৪০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজসহ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে ।
এত ব্যাপক অগ্রগতির পরও পাহাড়ের শান্তি বিঘ্নিত হওয়ার মূল কারণ জেএসএস-এর একক শর্ত পূরণে ব্যর্থতা। চুক্তির 'ঘ' খন্ডে জেএসএসকে অস্ত্র সমর্পণের প্রধান শর্ত দেওয়া হলেও তারা শুধুমাত্র পুরাতন ও জরাজীর্ণ কিছু অস্ত্র জমা দিয়ে দায় সারে । সরকারের পক্ষ থেকে শান্তিবাহিনীর সদস্যের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা এবং ৭১৫ জনকে পুলিশ বাহিনীতে চাকরি দেওয়া সত্ত্বেও জেএসএস-এর পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ হয়নি। এর ফলস্বরূপ, জেএসএস ও তাদের বিভাজিত উপদল- ইউপিডিএফ, কেএনএফ অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে চাঁদাবাজির 'ছায়া অর্থনীতি' চালু রেখেছে, যার ফলে পার্বত্য অঞ্চলের সাধারণ মানুষ খুন ও অপহরণের শিকার হচ্ছে । জেএসএস কর্তৃক নিরস্ত্রীকরণের প্রধান শর্ত পূরণে ব্যর্থতাই আজকের অশান্ত পাহাড়ের মূল কারণ ।


