২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান ও নিরাপত্তা কৌশলেও এসেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, দিল্লি এখন আরাকান আর্মির মতো মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ স্থাপন করছে—যা কয়েক বছর আগেও কল্পনাতীত ছিল।
মিয়ানমারে ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর ভারত সামরিক জান্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। সীমান্ত নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সংযোগ এবং চীনের প্রভাব মোকাবেলায় ভারত জান্তার পাশে থাকায় অটল ছিল। বিশেষ করে কালাদান মাল্টিমোডাল প্রজেক্টের অগ্রগতির জন্য ভারতের কাছে রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
তবে বাস্তবতা বদলে যায় যখন জান্তা সরকার সীমান্তবর্তী এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্টগুলো হারাতে শুরু করে। আর ২০২৪ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে ভারতের কাছে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের নিশ্চয়তা নিয়েও তৈরি হয় অনিশ্চয়তা।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্টের পর ভারতের সিনিয়র কর্মকর্তারা একাধিকবার আরাকান আর্মির প্রতিনিধিদের সঙ্গে গোপনে বৈঠক করেছেন। মিজোরামে লংত্লাই জেলার ডেপুটি কমিশনার পর্যন্ত সীমান্ত পার হয়ে পালেতাও টাউনশিপে গিয়ে প্রকল্প পরিদর্শন করেন।
মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রী ও রাজ্য প্রশাসনের কর্মকর্তারাও আইজলে গোপনে আরাকান আর্মির নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এসব উদ্যোগ ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের সরাসরি নির্দেশনায়।
ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির প্রধান ভিত্তি হলো কালাদান প্রকল্প। রাখাইনের পালেতাও এবং সিত্তে শহরের সঙ্গে ভারতের মিজোরামের সরাসরি সংযোগ স্থাপন করাই এর উদ্দেশ্য। চট্টগ্রাম বন্দর অনিশ্চিত হয়ে যাওয়ায় ভারত আবারও কালাদানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
২০২৩ সালের নভেম্বরে দিল্লিতে ভারত সরকারের সহযোগী থিংকট্যাংক ICWA মিয়ানমারের বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে একটি সেমিনারে আমন্ত্রণ জানায়। এতে অংশ নেয় আরাকান, চিন ও কাচিন গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা। ধারণা করা হচ্ছে, ভারতের নীতিগত অবস্থান বদলের বার্তা পৌঁছে দিতে এবং জান্তার প্রতিক্রিয়া যাচাই করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ভারতের এই নতুন ধারা শুধু নিরাপত্তা নয়, কৌশলগত ভারসাম্যের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। রাখাইনে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে ভারত চীনের প্রভাব ঠেকাতে চায়। একই সঙ্গে এটি চট্টগ্রাম বন্দর নির্ভরতা হ্রাসের একটি বিকল্প হিসেবেও কাজ করছে।
ভারতের জন্য মিয়ানমারের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা একটি নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। এতে দেখা যাচ্ছে, দিল্লি এখন বাস্তবতার নিরিখে কৌশল পাল্টাচ্ছে—জান্তা নয়, বরং অঞ্চল নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠীদের সঙ্গেই সম্পর্ক স্থাপন করছে।
হাসিনা পতনের পাল্টায় ভারতের মিয়ানমার নীতি, আরাকান আর্মির সঙ্গে সমঝোতা
দিল্লি এখন আরাকান আর্মির মতো মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ করছে।
সি
স্টাফ রিপোর্টার
১৩ এপ্রিল, ২০২৫ ৮:২৬ পূর্বাহ্ন২ মিনিট পড়া

ছবি : সংগৃহীত

