মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ) ও রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের মধ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশ সীমান্তেও। রোববার (১১ জানুয়ারি) সকালে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং সীমান্ত এলাকায় মিয়ানমার দিক থেকে ছোড়া গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছে বাংলাদেশি এক শিশু। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে।
আহত শিশুটির নাম হুজাইফা সুলতানা আফনান (৯)। সে হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল এলাকার বাসিন্দা এবং স্থানীয় হাজি মোহাম্মদ হোছন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। একই ঘটনায় আরও একজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে স্থানীয় প্রশাসন নিশ্চিত করেছে।
সীমান্তের ওপারে সংঘর্ষের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টেকনাফের বিস্তীর্ণ সীমান্ত এলাকায় ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা জানান, শনিবার সন্ধ্যা থেকে রোববার সকাল পর্যন্ত হোয়াইক্যং সীমান্তে একের পর এক গোলার বিস্ফোরণ এবং শত শত রাউন্ড গুলি বিনিময়ের শব্দ শোনা যায়। ভারী অস্ত্রের বিকট শব্দে এপারের বাড়িঘর কেঁপে ওঠে। ছোড়া গুলি চিংড়ি ঘের ও চাষাবাদের জমিতে এসে পড়ায় নারী ও শিশুরা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রোববার সকালে সীমান্তের ওপারে আরাকান আর্মি ও রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে কয়েক ঘণ্টাব্যাপী গোলাগুলি চলে। একপর্যায়ে মিয়ানমার দিক থেকে ছোড়া গুলি বাংলাদেশ অংশের বসতবাড়িতে আঘাত হানে। এতে নিজ বাড়ির সামনে খেলার সময় গুলিবিদ্ধ হয় শিশু হুজাইফা।
আহত শিশুর বাবা জসিম উদ্দিন বলেন, সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে আমার মেয়ে বাড়ির সামনে খেলছিল। হঠাৎ সীমান্তের বেড়িবাঁধের দিক থেকে এলোপাতাড়ি গুলি শুরু হলে সে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। গুলিটি তার কানের পাশ দিয়ে ঢুকে গেছে।
প্রথমে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে- এমন খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজনা দেখা দেয়। ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা হোয়াইক্যং এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে সেনাবাহিনীর একটি দল ও উখিয়া-টেকনাফের সাবেক সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয় এবং অবরোধ তুলে নেওয়া হয়। বর্তমানে এলাকায় অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন রয়েছে।
টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, গুলিটি মিয়ানমার দিক থেকেই এসেছে। তবে কারা গুলি ছুড়েছে, তা নিশ্চিত করতে তদন্ত চলছে।
চমেক হাসপাতালের অ্যানেসথেসিয়া ও আইসিইউ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক হারুন অর রশিদ জানান, আহত শিশুটির অবস্থা অত্যন্ত গুরুতর। তিনি বলেন, ‘গুলিটি মুখের এক পাশ দিয়ে ঢুকে মস্তিষ্কে প্রবেশ করেছে। শিশুটিকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে।’
হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শাহ জালাল বলেন, সীমান্তে কয়েকদিন ধরে চলমান গোলাগুলির কারণে পরিস্থিতি থমথমে। অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে এলাকা ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মি, রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী- আরসা, আরএসও ও নবী হোসেন গ্রুপ এবং মিয়ানমার জান্তার মধ্যে কয়েকদিন ধরে ত্রিমুখী সংঘর্ষ চলছে। ওই সংঘর্ষের ধারাবাহিকতায় সীমান্ত এলাকায় গোলাগুলির ঘটনা বাড়ছে।
রোববার সকালে নাফ নদের বিলাইছরি ও হাসরদ্বীপ এলাকায় ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়তে দেখা যায়। স্থানীয়দের দাবি, ড্রোন হামলা চালিয়ে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের লক্ষ্য করে আক্রমণ করে আরাকান আর্মি।
এদিকে রোববার টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশের চেষ্টাকালে ৫২ জনকে আটক করেছে বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আটককৃতরা মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সদস্য বলে ধারণা করা হলেও প্রাথমিক তল্লাশিতে তাদের কাছে কোনো অস্ত্র পাওয়া যায়নি।


