বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা ও ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মানবিক সহায়তায় জাপান জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলকে (ইউএনএফপিএ) ৫০০ মিলিয়ন ইয়েন, অর্থাৎ প্রায় ৩.২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদান দিচ্ছে। এই সহায়তার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে চলমান রোহিঙ্গা মানবিক সংকটে নিজেদের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করল জাপান।

দুই বছর মেয়াদি নতুন এই প্রকল্পের আওতায় কক্সবাজার ও ভাসানচরে বসবাসরত নারী ও কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য। জাপানের অর্থায়নে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা, অধিকার সংরক্ষণ এবং জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধসংক্রান্ত জীবনরক্ষাকারী সেবাগুলো অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে।

রোহিঙ্গা সংকট এখনো বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকট হিসেবে বিবেচিত। কক্সবাজারে বর্তমানে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বসবাস করছে, যাদের পাশাপাশি রয়েছে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠী। ২০২৪ সাল থেকে নতুন করে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, যাদের অর্ধেকেরও বেশি নারী ও কন্যাশিশু।

এত বিপুল চাহিদার বিপরীতে সাম্প্রতিক সময়ে তহবিল সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। এর ফলে ২০২৫–২০২৬ মেয়াদের রোহিঙ্গা মানবিক সংকটের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনা (জেআরপি) মারাত্মক অর্থসংকটে পড়েছে। তহবিলের ঘাটতির কারণে ইতোমধ্যে রোহিঙ্গাদের সেবায় নিয়োজিত ছয়টি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। এতে মিডওয়াইফের সংখ্যা ১৬ শতাংশ এবং জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা মোকাবিলায় কর্মরত জনবলের সংখ্যা ৫০ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে।

এই প্রেক্ষাপটে জাপানের নতুন অনুদানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘লাইফলাইন’ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এ অর্থায়নের ফলে ইউএনএফপিএ প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার মানুষকে সরাসরি সেবা দিতে পারবে। পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টা জরুরি প্রসূতি সেবা, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা মোকাবিলা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা কার্যক্রমও চালু থাকবে।

ইউএনএফপিএ’র প্রতিনিধি ক্যাথরিন ব্রিন কামকং বলেন, সংকটময় সময়ে নারী ও মেয়েদের জন্য জাপানের এই সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, এই অনুদান জীবনরক্ষাকারী সেবাগুলো সচল রাখতে সহায়তা করবে, যা না হলে নারী ও কিশোরীরা ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ত।

জাপানের অর্থায়নে পূর্বে পরিচালিত কার্যক্রমের সাফল্যের ধারাবাহিকতায়ই এই নতুন ধাপ শুরু হয়েছে। কক্সবাজার ও ভাসানচরে ইউএনএফপিএ সমর্থিত সেবা কেন্দ্রগুলো থেকে ইতোমধ্যে ৩৮ হাজারেরও বেশি নারী ও কন্যাশিশু প্রয়োজনীয় সেবা পেয়েছে। একই সঙ্গে নারী-বান্ধব কেন্দ্র ও নারীদের পরিচালিত কমিউনিটি সেন্টারের মাধ্যমে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার শিকারদের জন্য বিশেষায়িত সেবাও সম্প্রসারিত হয়েছে।

এছাড়া জাপানের সহায়তায় ভাসানচরে চালু হওয়া ২০ শয্যার হাসপাতালটি ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের অন্যত্র স্থানান্তরের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে এবং মাতৃমৃত্যু হ্রাসে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। কিশোর-কিশোরীদের ক্ষমতায়নমূলক উদ্যোগগুলোও দীর্ঘমেয়াদে জেন্ডার সমতা ও সহিংসতা প্রতিরোধে অবদান রাখছে।

২০১৭ সাল থেকে জাপান সরকার ইউএনএফপিএসহ বিভিন্ন জাতিসংঘ সংস্থা ও এনজিওর মাধ্যমে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা মানবিক সহায়তায় মোট ২৫০ মিলিয়নেরও বেশি মার্কিন ডলার প্রদান করেছে। এর ফলে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সহায়তায় জাপানকে অন্যতম নির্ভরযোগ্য ও ধারাবাহিক অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি আশা প্রকাশ করে বলেন, এই সহায়তা রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী উভয়ের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, বিশেষ করে নারী ও কিশোর-কিশোরীদের সুরক্ষা ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে জাপান প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং ইউএনএফপিএ’র সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সেবাগুলোর নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ অব্যাহত রাখতে তারা আগ্রহী।

এই অংশীদারিত্বের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সংহতি আরও জোরদার হবে এবং রোহিঙ্গা সংকটে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা নারী ও কন্যাশিশুদের স্বাস্থ্য, সুরক্ষা ও মর্যাদা রক্ষায় বিনিয়োগ অব্যাহত থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।