আগস্ট-সেপ্টেম্বর-অক্টোবর—এই তিন মাস এলে পাহাড় যেন অশান্ত হয়ে ওঠে। প্রতি বছরই এ সময় কোনো না কোনো ইস্যুকে ঘিরে পার্বত্য চট্টগ্রামে সহিংস পরিস্থিতির জন্ম হয়। গত বছরের সেপ্টেম্বরে পাহাড়ি-বাঙালি সহিংসতার ক্ষত শুকায়নি, এর মধ্যেই এবারও খাগড়াছড়ি অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠল।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি জেলা সদরের সীঙ্গিনালা এলাকায় মারমা সম্প্রদায়ের এক স্কুলছাত্রী ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে সহিংস আন্দোলনে নামে ‘জুম্ম ছাত্র-জনতা’ নামের একটি সংগঠন। কিন্তু অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ভিন্ন চিত্র—এই ব্যানারের আড়ালে মাঠে নামানো হয়েছে ইউপিডিএফ কর্মীদের।
অভিযোগ ওঠার পর সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় অভিযান চালিয়ে নয়ন শীল নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালত তার সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তবে চিকিৎসকদের মেডিকেল পরীক্ষার রিপোর্টে ওই ছাত্রীর ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। এদিকে মামলায় যাদের নাম এসেছে তাদের মধ্যে চাকমা, মারমা ও হিন্দু যুবক রয়েছে—কোনো মুসলিম যুবকের সম্পৃক্ততা নেই। অথচ ইউপিডিএফ এই ঘটনাকে বাঙালি-উপজাতি দাঙ্গায় রূপ দিতে চেয়েছিল।
খাগড়াছড়িতে সহিংস আন্দোলনের মুখোশ খুলতে শুরু করেছে। মারমা সম্প্রদায়ের দুটি বৃহৎ সংগঠন—বাংলাদেশ মারমা ঐক্য পরিষদ ও মারমা উন্নয়ন সংসদ—যৌথ বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, শান্তিপ্রিয় মারমা জনগণ কোনোভাবেই এই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত নয়। তাদের ভাষায়, “জুম্ম ছাত্র-জনতা ব্যানারের আড়ালে বিশেষ মহল পাহাড়ে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে।”
প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২৮ সেপ্টেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমার সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেওয়া ৬ জন আন্দোলনকারী স্বীকার করেন, তারা সকলে ইউপিডিএফের কর্মী। এই তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই আন্দোলনে ভাঙন শুরু হয়।
সংবাদমাধ্যম যুগান্তরের খবরে বলা হয়, “পুরো ঘটনাকে আন্তর্জাতিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এর নেপথ্যে রয়েছেন ভারতের রাজধানী দিল্লিতে বসবাসরত দীঘিনালার এক কথিত বৌদ্ধ ভিক্ষু। তিনিই বিদেশি মহলের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে আন্দোলনের ছক আঁকছেন। পরিকল্পনা হলো—যেকোনো ইস্যুকে কেন্দ্র করে পাহাড়ে সহিংসতা ছড়িয়ে দেওয়া, তারপর সেনাবাহিনীর উপস্থিতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বিদেশি মহলে বাংলাদেশকে চাপে ফেলা।”
শুরুতে আন্দোলন ধর্ষণ বিচারের দাবিতে হলেও ক্রমেই তা রূপ নেয় রাষ্ট্রবিরোধী স্লোগানে। মিছিলে ধ্বনিত হয়—“পাহাড় থেকে সেনা হঠাও।” সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে পরিকল্পিত প্রচারণা চালানো হয়। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি ইউপিডিএফের পুরোনো কৌশল—একটি অপরাধকে পুঁজি করে সেনা-বিরোধী রাজনৈতিক ইস্যু বানানো।
অবরোধ চলাকালে খাগড়াছড়ি জেলায় দোকানপাট, ঘরবাড়ি, যানবাহনে হামলা চালানো হয়। একাধিক স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ হয়। বিজিবি, পুলিশ ও সেনা সদস্যদের ওপর হামলা হয় বারবার। উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে প্রশাসন খাগড়াছড়ি সদর ও গুইমারায় ১৪৪ ধারা জারি করে। সহিংসতায় তিনজন নিহত এবং অন্তত ১৫ জন আহত হন।
চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. জিয়াউদ্দিন গণমাধ্যমে বলেন, “প্রশাসনের সব শাখা শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কাজ করছে। তবে একটি মহল নতুন নতুন এলাকায় উত্তেজনা ছড়াতে চাইছে। আমরা আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করছি।”
টানা সহিংসতার পর আট দফা দাবি নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকে বসে আন্দোলনকারীরা। দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে অবশেষে ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে ঘোষণা দেয়—৫ অক্টোবর পর্যন্ত অবরোধ স্থগিত থাকবে। ফলে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে খাগড়াছড়িতে। দোকানপাট খুলতে শুরু করে, যানবাহন চলে স্বাভাবিক নিয়মে, এমনকি পর্যটকরাও সাজেকে যেতে শুরু করেছেন।
মারমা সংগঠনগুলোর বিরোধিতা, মেডিকেল রিপোর্টের অসঙ্গতি এবং ইউপিডিএফ কর্মীদের স্বীকারোক্তি—সবই প্রমাণ করছে ‘জুম্ম ছাত্র-জনতা’ কেবল একটি মুখোশ। সচেতন মহলের প্রশ্ন—বিদেশি অর্থায়ন, এনজিও নেটওয়ার্ক ও দিল্লি-ভিত্তিক মহলের কলকাঠি নেড়ে পাহাড়ে যে নাশকতার খেলা চলছে, তা কতোটা দ্রুত রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিকভাবে মোকাবিলা করা হবে?


