মিয়ানমার সীমান্তবর্তী কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং এলাকায় সশস্ত্র রোহিঙ্গা গোষ্ঠী ও মায়ানমারের বিদ্রোহী সংগঠন আরাকান আর্মির মধ্যে চলমান সংঘর্ষে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও জেলেরা। গোলাগুলি ও স্থলমাইনের আশঙ্কায় নাফ নদীতে মাছ শিকার বন্ধ হয়ে পড়ায় কয়েক শ পরিবারের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে।

সর্বশেষ গত ১১ জানুয়ারি মিয়ানমার দিক থেকে ছোড়া গুলিতে হোয়াইক্যংয়ের লম্বাবিল তেচ্ছিব্রিজ এলাকায় গুরুতর আহত হয় ১২ বছর বয়সী বাংলাদেশি শিশু আফনান। সে বর্তমানে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এর পরদিন ১২ জানুয়ারি হোয়াইক্যং ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী নাফ নদীর একটি দ্বীপে মাছের প্রজেক্টে কাজ করার সময় আরাকান আর্মির পুঁতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণে গুরুতর আহত হন মো. হানিফ (২৮)। বিস্ফোরণে তার বাম পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তিনি বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এই দুটি ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বাংলাদেশ -মায়ানমারের জলসীমার কাছাকাছি অবস্থিত কয়েকটি দ্বীপে অবস্থান নেওয়া সশস্ত্র রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর হামলার জবাবে আরাকান আর্মি পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। এতে গুলি ও মর্টার শেল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এসে পড়ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ -মায়ানমারের জলসীমার কাছাকাছি ছোট-বড় পাঁচটি দ্বীপ রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের জলসীমায় অবস্থিত হসর দ্বীপ, বিলাসীর দ্বীপ, কোসর দ্বীপ, শাহজাহান দ্বীপ ও রইক্ষং দ্বীপে একাধিক রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর অবস্থান রয়েছে। এসব গোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে আরাকান রোহিঙ্গা আর্মি (এআরএ), রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) এবং রোহিঙ্গা ইসলামী মাহাস (আরআইএম)। এআরএর নেতৃত্বে রয়েছেন নবী হোসেন, যার বিরুদ্ধে মাদক চোরাচালান ও সীমান্তে অস্থিরতা সৃষ্টির একাধিক অভিযোগ রয়েছে। আরএসও দীর্ঘদিনের পুরোনো সংগঠন হলেও সম্প্রতি সীমান্ত ও রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে নাফ নদীর মায়ানমার অংশে অবস্থিত তোতার দ্বীপে অবস্থান করছে আরাকান আর্মি। এসব দ্বীপকে কেন্দ্র করে গত কয়েক মাস ধরে উভয় পক্ষের মধ্যে নিয়মিত গোলাগুলির ঘটনা ঘটছে।

সংবাদমাধ্যম খবরের কাগজের এক প্রতিবেদনে বলায়- নাফ নদীর জেলে সমাজ কমিটির তথ্য অনুযায়ী, উখিয়ার পালংখালী খালের উত্তর অংশ থেকে হোয়াইক্যংয়ের ঝিমংখালী পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় ২০৫ জন নিবন্ধিত জেলে নাফ নদীতে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তবে গত ৯ জানুয়ারি থেকে গোলাগুলি ও মাইন আতঙ্কের কারণে জেলেরা নদীতে নামছেন না।

জেলেদের দাবি, রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর চলাচল ঠেকাতে আরাকান আর্মি নদীর পাড় ও দ্বীপসংলগ্ন এলাকায় স্থলমাইন পুঁতে রেখেছে। এতে নদী ও আশপাশের মাছের ঘেরগুলো কার্যত মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।

হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড নাফ নদী জেলে সমাজ কমিটির সভাপতি দেলোয়ার হোসেন বলেন, “আরসা, নবী হোসেন গ্রুপ ও ইসলাম গ্রুপসহ কয়েকটি রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী বাংলাদেশের সীমানা অতিক্রম করে নাফ নদী এলাকায় অবস্থান নেয়। তারা থাকলেই আরাকান আর্মি গুলি চালায়। এসব গোষ্ঠীকে সীমান্ত অতিক্রম করতে না দিলে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটবে না।”

তিনি আরও বলেন, “গত দুই মাস ধরে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী ও আরাকান আর্মির মধ্যে গুলিবিনিময়ের কারণে আমরা নাফ নদীতে মাছ ধরতে পারছি না। আমাদের পরিবারগুলো চরম দুর্ভোগে পড়েছে।”

হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড নাফ নদী জেলে সমাজ কমিটির সভাপতি মো. হাসান বলেন, “প্রায় ১০ দিন ধরে জেলেরা মাছ শিকারে যেতে পারছেন না। মাছ ধরাই তাদের একমাত্র জীবিকার উৎস। এই অবস্থা চলতে থাকলে ভয়াবহ মানবিক সংকট দেখা দেবে।”

তিনি বলেন, “দ্বীপগুলোতে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী ও আরাকান আর্মির মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় আমরা সব সময় আতঙ্কে থাকি। আমরা শান্তিতে বাঁচতে চাই।” এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে তারা সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে স্মারকলিপিও দিয়েছেন বলে জানান তিনি।

হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. শাহ জালাল বলেন, “বাংলাদেশের বেড়িবাঁধের বাইরে নাফ নদীসংলগ্ন কেওড়া বাগানে ছোট ছোট ঘর নির্মাণ করে কয়েকটি রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী অবস্থান নিয়েছে। তারা সুযোগ পেলেই আরাকান আর্মির ওপর গুলি চালায়। পাল্টা গুলিতে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ঝুঁকির মুখে পড়ছে।”

এদিকে হোয়াইক্যং সীমান্তের নাফ নদী ও বেড়িবাঁধ এলাকায় টহল জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। সীমান্ত পরিস্থিতি নজরদারিতে রাখা হলেও স্থানীয়দের দাবি, স্থায়ী সমাধানের জন্য রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে পুরোপুরি সীমান্ত ও দ্বীপ এলাকা থেকে সরাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।