বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমানের ৫৩ তম শাহাদাতবার্ষিকী আজ। তিনি ১৯৭১ সালের ২৮ অক্টোবর মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের ধলইয়ে সম্মুখযুদ্ধে অসম সাহসীকতার সঙ্গে যুদ্ধ করে শহীদ হন। 
ওইদিন ভোর ৪ টার দিকে লেফটেন্যান্ট আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী এবং লেফটেন্যান্ট নুরের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর ১২৫ জনের একটি দল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দুর্ভেদ্য ধলই ঘাঁটির ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়। এসময় প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর ৩০এ ফ্রন্টিয়ার রেজিমেন্টের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এক পর্যায়ে মুক্তিবাহিনী পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর মেশিনগান পোস্টে গ্রেনেড হামলার সিদ্ধান্ত নেয়। গ্রেনেড ছোড়ার দায়িত্ব দেয়া হয় সিপাহী হামিদুর রহমানকে। তিনি পাহাড়ি খালের মধ্য দিয়ে বুকে হেঁটে গ্রেনেড নিয়ে আক্রমণ শুরু করেন। দুটি গ্রেনেড সফলভাবে মেশিনগান পোস্টে আঘাত হানে, কিন্তু তার পরপরই হামিদুর রহমান গুলিবিদ্ধ হন। শহীদ হন তিনি। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মুক্তিযোদ্ধারা সেদিন হানাদার বাহিনীকে পরাস্ত করে সীমানা ফাঁড়িটি দখল করতে সমর্থ হন। এই যুদ্ধে হাওলাদার মকবুল হোসেন ও সিপাহি আব্দুর রহমান অসামান্য বীরত্ব প্রদর্শন করেন। মুক্তিযুদ্ধে বীরোচিত ভূমিকার জন্য তিনি সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত হন। 
হামিদুর রহমানের গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুরের খোরদা খালিশপুর গ্রামে। হামিদুর রহমান সেনাবাহিনীর সিপাহি পদে ১৯৭০ সালে যোগ দেন। পরের বছরের অক্টোবরে তিনি প্রথম ইস্টবেঙ্গল সি কোম্পানির হয়ে ধলই সীমান্তের ফাঁড়ি দখল অভিযানে অংশ নেন।
৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে শহিদ হওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে হামিদুর রহমানকে সীমান্তের অল্প দূরে ভারতীয় ভূখন্ডে ত্রিপুরা রাজ্যের হাতিমেরছড়া গ্রামের স্থানীয় এক পরিবারের পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়। নিচু স্থানে অবস্থিত কবরটি এক সময় পানির তলায় তলিয়ে যায়।
২০০৭ সালের ২৭শে অক্টোবর বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকার হামিদুর রহমানের দেহ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই অনুযায়ী ২০০৭ সালের ১০ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ রাইফেলসের একটি দল ত্রিপুরা সীমান্তে হামিদুর রহমানের দেহাবশেষ গ্রহণ করে, এবং যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে কুমিল্লার বিবিরহাট সীমান্ত দিয়ে শহীদের দেহাবশেষ বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। ১১ই ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বীর শ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানকে ঢাকার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
তার স্মরণে ১৯৯২ সালে ধলই চা বাগানে নির্মিত হয়েছে স্মৃতিসৌধ। তৎকালীন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের উদ্যোগে কমলগঞ্জ পৌরসভার ভানুগাছ চৌমুহনা থেকে স্মৃতিসৌধ পর্যন্ত রাস্তার নামকরণ করা হয় বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী হামিদুর রহমান সড়ক। ভানুগাছ চৌমুহনায় বসানো হয় নামফলক। তার নামফলক ভেঙে স্থানীয় এমপি আব্দুস শহীদের নাম সম্বলিত কমলগঞ্জ এলজিইডি রাস্তার উন্নয়ন কাজের উদ্বোধনী ফলক বসানো হয়। পরে এই বীরশ্রেষ্ঠ'র নামফলকটি আর স্থাপন হয়নি। মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের পর নতুনফলক স্থাপন করে পরিবর্তন করা হয়েছে সড়কের নাম। 
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার জয়নাল আবেদীন বলেন, কমলগঞ্জ উপজেলার ভানুগাছ চৌমহনায় বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামফলক ছিল শুনেছি। সড়ক সংস্কারের সময় নামফলক সরানো হয়। আমরা এটা পুনঃস্থাপনের ব্যবস্থা করবো।
দিনটি উপলক্ষে শহীদের রক্তে ভেজা ধলই সীমান্তে প্রতি বছরের মতো আজ উপজেলা প্রশাসন, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল, বিজিবি ব্যাটালিয়ন কমান্ড ও প্রেস ক্লাবের পক্ষ থেকে হামিদুর রহমানের স্মৃতিসৌধে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করা হবে।

-পার্বত্য সময়