মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যজুড়ে চলমান সহিংসতা এখন শুধু মিয়ানমারের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়—এর প্রতিফলন স্পষ্টভাবে পড়ছে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তেও। সংবাদমাধ্যম কালের কণ্ঠের একটি খবরে বলা হয়েছে- সাম্প্রতিক সময়ে নিরাপত্তা সংস্থার গোয়েন্দা প্রতিবেদন বলছে, রাখাইন রাজ্যে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে লুট হওয়া বিপুল অস্ত্র এখন সাতটি ভিন্ন সীমান্তপথে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।

রোহিঙ্গা সঙ্কটের পর ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে গঠিত হয় সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মি (AA)। ২০২৩ সালের ১৩ নভেম্বর থেকে তারা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে নামে, যার লক্ষ্য রাখাইন রাজ্যকে বিচ্ছিন্ন করা।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আরাকান আর্মি মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিপি) ও সেনাদের একাধিক ঘাঁটি দখল করে রাখাইন রাজ্যের প্রায় পুরো অংশ নিয়ন্ত্রণে নেয়। এতে মিয়ানমার বাহিনীর শত শত সদস্য পালিয়ে আশ্রয় নেয় বাংলাদেশে।
এই সময় রোহিঙ্গা সশস্ত্র সংগঠন আরসা (ARSA) ও আরএসও (RSO)-এর সদস্যরা সুযোগ বুঝে মিয়ানমার সেনাদের ফেলে যাওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট করে নেয়। পরবর্তীতে খাদ্য ও অর্থ সংকটে পড়া আরাকান আর্মি এসব অস্ত্র বিক্রি শুরু করে বাংলাদেশের বিভিন্ন অপরাধীচক্র ও দালাল নেটওয়ার্কের কাছে।
সাতটি পথ দিয়ে অস্ত্র পাচার
নিরাপত্তা সূত্রে জানা গেছে, মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে অস্ত্র পাচারের প্রধান সাতটি রুট হলো— নাইক্ষ্যংছড়ি–তুমব্রু সীমান্ত, ঘুমধুম–রেজু আমতলী ঘোনাপাড়া এলাকা, উখিয়ার পালংখালী–রোহিঙ্গা ক্যাম্পঘেঁষা বনাঞ্চল, টেকনাফের নাফ নদী ঘেঁষা শাহপরীর দ্বীপ, আলীকদম–থানচি সীমান্তপথ,
রুমা–রেমাক্রি ট্র্যাক, এবং লামা হয়ে লংগদু পর্যন্ত বিস্তৃত পাহাড়ি গোপন ট্রেইল।
এসব পথে স্থানীয় রোহিঙ্গা চক্র, সীমান্তপারের ব্যবসায়ী ও পার্বত্য অঞ্চলের অস্ত্র ব্যবসায়ীরা একযোগে পাচার কার্যক্রম চালাচ্ছে। পাচারকৃত অস্ত্রের বড় অংশ বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর দেশের বিভিন্ন অপরাধীচক্রের কাছে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ আছে।
রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাতের কারণে সেখানে খাদ্য ও জ্বালানির চরম সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে আরাকান আর্মি বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর সঙ্গে পণ্য-বিনিময় বাণিজ্যে যুক্ত হয়—যেখানে অস্ত্রের বিনিময়ে খাদ্য ও নিত্যপণ্য বিনিময় হচ্ছে নিয়মিত।
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও স্থানীয় জামায়াত নেতা তোফায়েল আহমদ সম্প্রতি এক সভায় এ নিয়ে বলেন, “বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে আরাকানে নিত্যপণ্য পাচার এমনই বেড়েছে যে, কক্সবাজারের হাজী বিরিয়ানি দিয়েই এখন আরাকান আর্মির সকালের নাশতা সারা হচ্ছে।”

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত এখন বাংলাদেশের জন্য সরাসরি নিরাপত্তা হুমকি হয়ে উঠছে। একদিকে সীমান্ত দিয়ে বাড়ছে অস্ত্র প্রবাহ, অন্যদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে নতুন করে সংগঠিত হচ্ছে সশস্ত্র গোষ্ঠী।
বাংলাদেশের একটি নিরাপত্তা সংস্থার এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, “আরাকান আর্মি এখন অস্ত্র ব্যবসাকে তাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করছে। সেই অস্ত্রই এখন বাংলাদেশে অপরাধীচক্রের হাতে পড়ছে, যা ভবিষ্যতে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হতে পারে।”