বছরের শুরুতেই ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা, হতাশা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরতে মাঠে সক্রিয় হয়েছে ‘সিএইচটি সম্প্রীতি জোট’। জোটের মুখপাত্র পাইশিখই মারমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ আর বিভ্রান্তি ও সহিংস রাজনীতির পথে হাঁটতে চায় না।
পাইশিখই মারমা বলেন, “আমরা পাহাড়ের সন্তান। জন্মের পর থেকেই বঞ্চনা, জটিলতা ও অবহেলার মধ্যেই বড় হয়েছি। দীর্ঘদিন ধরে দেখছি, জেএসএস ও ইউপিডিএফের মতো আঞ্চলিক বিচ্ছিন্ন সংগঠনগুলো অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি আর চাঁদাবাজির মাধ্যমে পাহাড়ে আতঙ্ক তৈরি করেছে। নিজেদের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পশ্চিম ও উত্তর পাহাড়ে ভারী অস্ত্রের সংঘর্ষ হয়েছে, যার ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।”
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব সংঘাত পাহাড়ে শান্তি নয়, বরং বিভ্রান্তি ও অস্থিরতা বাড়িয়েছে। পাশাপাশি বছরে একাধিকবার বাঙালি ও অ-বাঙালিদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠী এসব ঘটনাকে পুঁজি করে জাতীয় গণমাধ্যমে নিজেদের বয়ান প্রতিষ্ঠা করে ফায়দা লুটছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পাইশিখই মারমা আরও বলেন, “চাকমা জাতির নেতৃত্বাধীন কিছু আঞ্চলিক সংগঠন প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকায় নারী ও কোমলমতি শিশুদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে। এতে পাহাড়ের সাধারণ মানুষ আরও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছে।”
পাহাড়ের মানুষ কী চায়?
পাইশিখই মারমার মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ মূলত শান্তিপ্রিয়। তারা সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও অস্ত্রের রাজনীতি থেকে মুক্তি চায়। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়েছে, তথাকথিত শান্তি চুক্তির বয়স প্রায় ২৯ বছর। কিন্তু পাহাড়ের মানুষ বাস্তবে কী পেল? আমরা ব্যর্থ হয়েছি নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেমিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে।”
তার দাবি, বর্তমানে অন্তত সাতটি সশস্ত্র বিচ্ছিন্ন সংগঠন পাহাড়ে সক্রিয় রয়েছে, যারা তরুণদের অবৈধ অস্ত্রের পথে ঠেলে দিচ্ছে। একই সঙ্গে সাধারণ জনগণকে পরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনীর মুখোমুখি দাঁড় করানোর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, “রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা কি কখনো গভীরভাবে ভেবেছেন- পার্বত্য চট্টগ্রাম যে বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেই বোধ জনগণের মধ্যে কীভাবে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়?”
নির্বাচন এলেই পুরনো বয়ান
পাইশিখই মারমা বলেন, প্রতি পাঁচ বছর পরপর জাতীয় নির্বাচন এলেই পাহাড়ে ‘ভাই-ভাই’ সম্প্রীতির বয়ান শোনা যায়। কিন্তু ভোটের মাঠে নেমে আঞ্চলিক বিচ্ছিন্ন সংগঠনগুলো নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে স্বতন্ত্র প্রার্থী দাঁড় করায় এবং গ্রামগঞ্জে প্রভাব খাটিয়ে বাঙালি প্রার্থীকে ভোট না দেওয়ার জন্য প্রচারণা চালায়।
তার মতে, এই রাজনৈতিক মগজধোলাই পাহাড়ের মানুষের প্রকৃত অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সমাধানের পথ কী?
সিএইচটি সম্প্রীতি জোটের মুখপাত্র বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের টেকসই সমাধানের জন্য একটাই মৌলিক নীতি প্রয়োজন- নতুন প্রজন্মকে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। নির্বাচনের সময় স্থানীয় তথাকথিত রাজনৈতিক কর্মীদের বিভাজনমূলক বয়ান বন্ধ করতে হবে।
তিনি বলেন, “বিচ্ছিন্ন সংগঠনগুলোর মগজধোলাই কার্যক্রম বন্ধে রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে পূর্ণ ক্ষমতা দিয়ে আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা জরুরি।”
একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বেকারত্ব দূরীকরণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর জোর দেন তিনি। পাইশিখই মারমার মতে, আন্তরিক ও দক্ষ সামরিক কর্মকর্তা, দেশপ্রেমিক নাগরিক সমাজ এবং রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগেই পাহাড়ে বাঙালি ও অ-বাঙালিদের মধ্যকার সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত সমাধানের পথে এগোনো সম্ভব।


