বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকাহত পুরো দেশ। এই শোকের ছায়া পড়েছে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতেও। বিশেষ করে ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা সংকটকালে তার মানবিক অবস্থান ও সরাসরি ক্যাম্প পরিদর্শনের স্মৃতি নতুন করে নাড়া দিয়েছে নির্যাতিত এই জনগোষ্ঠীকে।

বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জোহরের নামাজ শেষে বেগম খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হয়। একাধিক ক্যাম্পে রোহিঙ্গা নেতাদের উদ্যোগে পৃথক দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়, যেখানে অংশ নেন হাজারো আশ্রিত রোহিঙ্গা।

রোহিঙ্গা নেতারা জানান, সংকটের সূচনালগ্নে যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা ছিল সীমিত এবং ভবিষ্যৎ ছিল অনিশ্চিত, তখন একজন জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া নিজে ক্যাম্পে এসে তাদের দুর্দশা প্রত্যক্ষ করেন। সেই মানবিক উপস্থিতি রোহিঙ্গাদের কাছে কেবল রাজনৈতিক সহমর্মিতা নয়, বরং এক ধরনের নৈতিক আশ্বাস হিসেবেও বিবেচিত হয়েছে।

উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা নূর মোহাম্মদ বলেন, আমরা জীবন বাঁচিয়ে পালিয়ে এসেছিলাম। তখন কোনো নিরাপত্তা ছিল না, কোনো আশার কথাও শোনা যাচ্ছিল না। সেই সময় বেগম খালেদা জিয়া আমাদের কাছে এসেছিলেন। একজন বড় নেত্রী হয়েও আমাদের কষ্টকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এই স্মৃতি আমরা ভুলতে পারি না।

টেকনাফের লেদা ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা ছৈয়দ আলম বলেন, তিনি শুধু ত্রাণ নিয়ে আসেননি; তিনি আমাদের মর্যাদার প্রশ্নটি সামনে এনেছিলেন। আন্তর্জাতিক মহলে রোহিঙ্গাদের ন্যায্য অধিকারের কথা তুলে ধরেছিলেন। তার মৃত্যুতে আমরা একজন মানবিক অভিভাবককে হারালাম।

রোহিঙ্গা নারী নেত্রী আব্বাসী বলেন, বালুখালী ক্যাম্পে ত্রাণ বিতরণের সময় তিনি একটি শিশুকে কোলে নিয়েছিলেন। সেই দৃশ্য আজও আমাদের চোখে ভাসে। একজন মা যেমন সন্তানের কষ্ট অনুভব করেন, তিনি ঠিক তেমনভাবেই আমাদের পরিস্থিতি বুঝেছিলেন।

রোহিঙ্গা নেতারা স্মরণ করিয়ে দেন, ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর বেগম খালেদা জিয়া উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। ওই সফরে তিনি রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানান এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ও দায়িত্বশীল হস্তক্ষেপের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনের দাবি তুলে ধরেন।

ওই সফরে রোহিঙ্গাদের জন্য মোট ৪৫ ট্রাক ত্রাণ নিয়ে আসা হয়। এর মধ্যে ছিল ১১০ টন চাল এবং পাঁচ হাজার শিশু ও পাঁচ হাজার গর্ভবতী নারীর জন্য বিশেষ খাদ্যসামগ্রী। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির প্রতিনিধি দল সরাসরি নয়টি ট্রাক ত্রাণ বিতরণ করে।

রোহিঙ্গা নেতা হাবিবুল্লাহ বলেন, অনেকেই আমাদের নিয়ে কথা বলেন, কিন্তু খুব কম মানুষই সংকটের সময় সরাসরি পাশে দাঁড়ান। বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন। আমরা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তার জন্য দোয়া করছি।

রোহিঙ্গাদের ভাষায়, বেগম খালেদা জিয়ার মানবিক সফর ও অবস্থান কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনাই নয়- এটি তাদের সংগ্রামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক স্মারক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই স্মৃতি তারা বহন করবে। দোয়া মাহফিলগুলোতে তার রুহের মাগফিরাত কামনা করে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা জানানো হয়- আল্লাহ তায়ালা যেন তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন।