ঢাকার আকাশ থেকে এখনও জুলাইয়ের সংকটের মেঘমালা কাটেনি। চলমান রাজনীতির অস্থিরতায় বাংলাদেশের জন্য এক তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে গেল জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের চার দিনের সফর। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন যখন বৈশ্বিক সহায়তা সংকোচনের ঘোষণা দিয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মাথাব্যথা বাড়িয়েছে, ঠিক সেই সময়ে গুতেরেসের ঢাকা আগমন কূটনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকটের নিষ্ক্রিয়তা ভেঙে আন্তর্জাতিক ফোরামে এই ইস্যুটি পুনরুজ্জীবিত করার প্রত্যাশা জেগেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সফর কি কূটনীতির প্রলেপ দেওয়া এক "সিম্বলিক জেসচার", না কি রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কারের পথে বাস্তব পদক্ষেপের সূচনা?

গুতেরেসের সফরের কেন্দ্রবিন্দু ছিল কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন। ১২ লাখ রোহিঙ্গার অস্থায়ী আবাসে "সলিডারিটি ইফতার"-এর মাধ্যমে তিনি মানবিক সংহতির বার্তা দিলেও, মিয়ানমারের সামরিক জান্তার অনড় অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিষ্ক্রিয়তাকে অস্বীকার করা যায় না। গুতেরেস নিজেই স্বীকার করেছেন, মিয়ানমারে চলমান গৃহযুদ্ধ (বিশেষ করে আরাকান আর্মি ও টাটমাডোর মধ্যে সংঘাত) এবং সেনাবাহিনীর নৃশংসতা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পথে প্রধান বাধা। তবে তার মন্তব্যে উল্লেখযোগ্য দিক হলো— "আরাকান আর্মিকেও আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে"। এটি একটি সহজাত প্রস্তাব, কারণ মিয়ানমার সরকার এই গোষ্ঠীকে বিদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে। গুতেরেসের এই অবস্থান কি রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘের ভূমিকাকে আরও সক্রিয় করবে, নাকি মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন সংঘাত ডেকে আনবে?

যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা হ্রাসের প্রেক্ষাপটে, রোহিঙ্গাদের জন্য খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা এখন মহাসংকট। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (WFP) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের রেশন ৩২% কেটে দেওয়া হয়েছে, যা আগস্ট নাগাদ ৫০%-এ পৌঁছাতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে গুতেরেসের প্রস্তাব "বাংলাদেশকে মানবিক করিডোর হিসেবে ব্যবহার করে মিয়ানমারে সহায়তা পাঠানো" একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ। কিন্তু এই প্রস্তাব বাস্তবায়নে চীন ও রাশিয়ার ভেটো প্রয়োগের ঝুঁকি রয়েই যায়, যারা ইতিমধ্যে মিয়ানমার জান্তাকে নিরাপদ আশ্রয় দিচ্ছে।

গুতেরেসের সফর কেবল রোহিঙ্গা ইস্যুতেই সীমিত ছিল না। ঢাকায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তার বৈঠক বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জাতিসংঘের আগ্রহেরই ইঙ্গিত দেয়। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুলের বক্তব্য "সংস্কার শেষ করে দ্রুত নির্বাচনের দিকে যেতে হবে" এবং জামায়াতের নেতা মিয়া গোলাম পরওয়ারের "জাতীয় ঐক্য জরুরি" দাবি থেকে স্পষ্ট, সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে আস্থার সংকট এখনও গভীর।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, জাতিসংঘ কি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট সমাধানে মধ্যস্থতার ভূমিকা নিতে পারবে? সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবিরের মতে, "গুতেরেসের সমর্থন মূলত নৈতিক। অভ্যন্তরীণ সংস্কারের দায়িত্ব বাংলাদেশের রাজনৈতিক শক্তিগুলোরই।" অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ সতর্ক করেছেন— "বৈশ্বিক শক্তিগুলো বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে, যা সার্বভৌমত্বের জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে।"

গুতেরেসের সফরের নেপথ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বৈশ্বিক শক্তিসাম্যের পরিবর্তন। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কমার পর বাংলাদেশের জন্য বিকল্প খুঁজতে হবে, যেখানে চীন ও ভারতের প্রভাব বাড়ছে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-তে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা বাড়ানো হয়েছে। গুতেরেসের এই সফর কি পশ্চিমা ব্লক ও এশীয় শক্তিগুলোর মধ্যে বাংলাদেশকে ভারসাম্য বজায় রাখার কৌশল হিসেবে কাজ করবে?

মিয়ানমার ইস্যুতেও এই জটিলতা প্রকট। চীন ও রাশিয়া মিয়ানমার জান্তাকে সমর্থন দিলেও, ভারত বাণিজ্যিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থে রাখাইন রাজ্যে বিনিয়োগ করছে। গুতেরেসের প্রস্তাবিত "মানবিক করিডোর" বাস্তবায়নে ভারত ও চীনের সম্মতি আদায় করা কি সম্ভব? নাকি এটি আরেকটি কূটনৈতিক অচলাবস্থার সূচনা করবে?

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন গুতেরেসের সফরকে "ঐতিহাসিক" আখ্যা দিয়েছেন। এখন অবধি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে অগ্রগতি শূন্যের কোঠায়। ২০১৭ সালের পর মাত্র ১,১০০ রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনের নামে মিয়ানমারে পাঠানো হয়েছে, যাদের অধিকাংশই ফিরে এসেছেন নির্যাতনের ভয়ে। গুতেরেসের সফরে এই ব্যর্থতার দায় মিয়ানমারের উপর চাপানো হলেও, আন্তর্জাতিক আদালতের (ICJ) রায় বাস্তবায়নে জাতিসংঘের ব্যর্থতা সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়।

এদিকে, বাংলাদেশের অর্থনীতির উপর রোহিঙ্গাদের চাপ ক্রমেই ভারসাম্যহীন করে তুলছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গাদের সহায়তায় বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলার খরচ করছে, যা জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় তহবিলের প্রায় ৩০%। গুতেরেসের সফরে জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি না থাকায়, এটি বাংলাদেশের জন্য হতাশাজনক বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।

গুতেরেসের ঢাকা সফর জাতিসংঘের সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনা দুটোই উন্মোচন করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধে জাতিসংঘের ব্যর্থতা এবং মিয়ানমারে নিষ্ক্রিয়তার পরিপ্রেক্ষিতে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে তার ভূমিকা অনেকেই "নৈতিক বক্তব্যের ফ্রেম" হিসেবে দেখছেন। তবে আশার কথা হলো, গুতেরেস রোহিঙ্গা শিবিরে তার সরব উপস্থিতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মিডিয়ার দৃষ্টি ফিরিয়ে আনতে পেরেছেন। রয়টার্স, আল জাজিরা এবং বিবিসির মতো গ্লোবাল মিডিয়া এখন আবার রোহিঙ্গা সংকটকে কভারেজ দিচ্ছে, যা মিয়ানমারকে চাপে ফেলতে পারে।

বাংলাদেশ বর্তমানে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি রয়েছে। প্রথমত, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান খোঁজা, যার জন্য মিয়ানমারের সঙ্গে সরাসরি কূটনৈতিক আলোচনা জোরদার করা এবং চীন-ভারতের মধ্যস্থতায় একটি আঞ্চলিক ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংলাপ স্থাপন, যেখানে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে আস্থা পুনরুদ্ধার এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিতকরণের জন্য কপ-২৮ সম্মেলনে বাংলাদেশের দাবিগুলো জোরালোভাবে উপস্থাপন এবং উন্নত দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি আদায় করা অপরিহার্য। চতুর্থত, যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প সহায়তা খোঁজার জন্য জাপান, সৌদি আরব এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব বাড়ানো প্রয়োজন। সর্বশেষ, আন্তর্জাতিক মিডিয়াকে সম্পৃক্ত করে রোহিঙ্গা সংকটের বর্তমান চিত্র বিশ্বদরবারে তুলে ধরা এবং গণসচেতনতা তৈরি করা বাংলাদেশ সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।

গুতেরেসের সফর বাংলাদেশের জন্য একটি মাইলফলক হতে পারত, যদি তা কূটনৈতিক অঙ্গীকারের বাইরে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নিত। কিন্তু জাতিসংঘের ইতিহাস বলছে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে এই প্রতিষ্ঠান প্রায়ই পিছিয়ে থাকে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের কাছে। বাংলাদেশের এখন কর্তব্য— আন্তর্জাতিক সহযোগিতার উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে স্বনির্ভর কূটনৈতিক কৌশল তৈরি করা। কারণ, রোহিঙ্গা সংকটের মতো জটিল ইস্যুতে "সাইলেন্ট ডিপ্লোমেসি" নয়, প্রয়োজন "অ্যাকশন-ওরিয়েন্টেড লিডারশিপ"।
 

--রিয়াজুল ইসলাম, গণমাধ্যমকর্মী