জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা একপর্যায়ে বাংলাদেশে আশ্রিত ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত নেওয়ার আশ্বাসও দেয়। তবে সেই ঘোষণার এক বছর পেরিয়ে গেলেও বাস্তবে কোনো প্রত্যাবাসন হয়নি। বরং একই সময়ে নতুন করে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে আরও এক লাখের বেশি রোহিঙ্গা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি–এর চলমান সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। এই সংঘাতের মাঝেই সহিংসতা, নির্যাতন ও নিরাপত্তাহীনতার শিকার হয়ে রোহিঙ্গারা প্রতিনিয়ত সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে।
ইউএনএইচসিআর ও বাংলাদেশের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন (আরআরআরসি) কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নতুন ও পুরনো মিলিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১ লাখ ৭৩ হাজার ১৭১ জনে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এক বছরে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩৭৮ জন রোহিঙ্গা। এর মধ্যে শুধু ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসেই অনুপ্রবেশের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৫১৮ জন।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ২০২৩ সালের নভেম্বরে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর মধ্যকার অঘোষিত শান্তি ভেঙে যাওয়ার পর মংডু এলাকায় সংঘর্ষ তীব্র হয়। এর পর থেকেই রোহিঙ্গাদের নতুন অনুপ্রবেশ শুরু হয়, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। তার ভাষায়, সমস্যার মূল উৎস সীমান্তের ওপারে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ বিষয়টি তুলছে, কিন্তু মিয়ানমারের কাছ থেকে কার্যকর সহযোগিতা মিলছে না।
ছাত্র–জনতার গণ–অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ড. মুহাম্মদ ইউনূস রোহিঙ্গা সংকটের রাজনৈতিক সমাধানে জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে তিন দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তবে সেসব প্রস্তাব বাস্তবায়নের কোনো অগ্রগতি হয়নি।
২০২৫ সালের মার্চে বাংলাদেশ সফরে আসেন এন্তোনিও গুতেরেস। সে সময় তিনি কক্সবাজারে এক লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে সংহতি ইফতারে অংশ নেন। ওই অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আগামী বছর যেন রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে ঈদ উদযাপন করতে পারে, সে লক্ষ্যে জাতিসংঘের সঙ্গে যৌথ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। বাস্তবে যদিও সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
পরবর্তী সময়ে ‘স্টেকহোল্ডারস ডায়ালগ: টেকঅ্যাওয়ে টু দ্য হাই-লেভেল কনফারেন্স অন দ্য রোহিঙ্গা সিচুয়েশন’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সংলাপে অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুত, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবর্তনের রোডম্যাপসহ সাত দফা প্রস্তাব তোলে। কিন্তু দাতা সংকট ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে সেগুলোরও বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি।
রোহিঙ্গাদের খাদ্য, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে সবচেয়ে বড় অর্থদাতা যুক্তরাষ্ট্র। তবে ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালের অক্টোবরে এসে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা অর্ধেকের নিচে নেমে আসে। অর্থের অভাবে রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য পরিচালিত বহু শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।
ওসিএইচএ–এর ফাইন্যান্সিয়াল ট্র্যাকিং সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান বাস্তবায়নে প্রয়োজন ছিল ৯৩ কোটি ৪৫ লাখ ডলার। কিন্তু ডিসেম্বর পর্যন্ত পাওয়া গেছে মাত্র ৪৬ কোটি ৪৪ লাখ ডলার- অর্থাৎ প্রয়োজনের মাত্র ৪৯ দশমিক ৭ শতাংশ। ফলে প্রায় ৪৭ কোটি ডলারের তহবিল ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
কোস্ট ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, স্থানীয় জনগণ এখন বুঝে গেছে রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত সমাধান সম্ভাবনা ক্ষীণ। তার মতে, ড. ইউনূসের উদ্যোগে মানুষ নতুন করে আশাবাদী হয়েছিল, কিন্তু প্রত্যাবাসনে কোনো অগ্রগতি না থাকায় হতাশা আরও বেড়েছে। এর মধ্যেই এক বছরে এক লাখের বেশি রোহিঙ্গার নতুন অনুপ্রবেশ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সূত্র- বণিক বার্তা


