নেত্রকোনায় অর্থের বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও জন্মনিবন্ধন তৈরি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, জেলা সদর উপজেলা নির্বাচন অফিস এবং কয়েকটি ইউনিয়ন পরিষদে সক্রিয় একটি সংঘবদ্ধ চক্র নিয়মবহির্ভূতভাবে রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করছে। এর ফলে তারা কার্যত বাংলাদেশি নাগরিকত্ব লাভ করছে- যা জাতীয় নিরাপত্তা ও নির্বাচন ব্যবস্থার জন্য গুরুতর হুমকি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদমাধ্যম আজকের পত্রিকার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, নেত্রকোনা সদর উপজেলা নির্বাচন অফিস থেকে ‘জান্নাত বেগম’ নামে এক নারীর জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করা হয়েছে। এনআইডি কার্ডে তার পিতা হিসেবে মো. আব্দুল হাসিম এবং মাতা হিসেবে মোসা. আনজুর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ঠিকানা দেওয়া হয়েছে সদর উপজেলার পুকুরিয়া গ্রাম। তবে এই তথ্য যাচাই করতে গিয়ে একাধিক ভয়াবহ অসংগতি ধরা পড়ে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মো. আব্দুল হাসিম ও মোসা. আনজু দম্পতি নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলার বিরামপুর গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন। প্রায় এক দশক আগে আব্দুল হাসিম মারা যান। তাদের সংসারে চার ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। একমাত্র মেয়ের নাম স্নিগ্ধা আক্তার হাসি। ‘জান্নাত বেগম’ নামে তাদের কোনো কন্যাসন্তান নেই।

আব্দুল হাসিমের ছেলে মোতাহার হোসেন বলেন, ‘জান্নাত বেগম নামে আমার কোনো বোন নেই। আমার একমাত্র বোন স্নিগ্ধা আক্তার হাসি, যিনি আট বছর আগে ধর্মপাশা সদরে বিয়ে করে সেখানকার ভোটার হয়েছেন।’

সংশ্লিষ্ট বড়কাশিয়া–বিরামপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আলী নূরও নিশ্চিত করেন, আব্দুল হাসিমের সংসারে জান্নাত বেগম নামে কোনো মেয়েসন্তান নেই।

ভোটার ডেটা এন্ট্রির প্রুফ কপিতে ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর যাচাই করেও গরমিল পাওয়া গেছে। নম্বরটিতে ফোন করলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করলে নম্বরটির ব্যবহারকারী আরফান শাকিল জানান, তিনি ময়মনসিংহের আকুয়া এলাকার বাসিন্দা এবং বর্তমানে চীনে উচ্চশিক্ষার জন্য অবস্থান করছেন। তিনি বলেন, ‘জান্নাত বেগম নামে কাউকে আমি চিনি না, ওই এলাকায়ও আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।’

এদিকে জান্নাত বেগমের নামে নির্বাচন অফিসে সংরক্ষিত জন্মনিবন্ধনের কপি নিয়ে নেত্রকোনা পৌরসভায় যোগাযোগ করা হলে কর্তৃপক্ষ জানায়, ওই জন্মনিবন্ধন তাদের সার্ভারে নেই। এটি অন্য একটি জন্মনিবন্ধন স্ক্যান করে ডিজিটালি সম্পাদনা করে তৈরি করা হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়ে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য ব্যবহৃত ফরম-২ পর্যালোচনায়। সেখানে শনাক্তকারী, সুপারভাইজর ও যাচাইকারীর এনআইডি নম্বর উল্লেখ থাকলেও সার্ভারে এসব নম্বরের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

সদর নির্বাচন অফিসের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জান্নাত বেগম একজন রোহিঙ্গা। দেড় লাখ টাকার বিনিময়ে তাকে ভোটার করা হয়েছে। তাদের দাবি, সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসার মো. সিহাব উদ্দিনের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছাড়াও জেলার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। একই কৌশলে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা করে প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি এনআইডি তৈরি করা হয়েছে।

ভোটার ফরম-২-এ সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসার মো. সিহাব উদ্দিনের স্বাক্ষর রয়েছে, যার তারিখ ২১ মার্চ ২০২৫।

অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মো. সিহাব উদ্দিন বলেন,‘ভোটার হালনাগাদের সময় জান্নাত বেগম ভোটার হয়েছেন। এত বিপুল সংখ্যক এনআইডি আলাদাভাবে যাচাই করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কোনো লেনদেন হয়নি। তদন্তে বহিরাগত প্রমাণিত হলে এনআইডি বাতিলের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।’

জেলা নির্বাচন অফিসার মোহাম্মদ তোফায়েল হোসেন বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে এবং রোহিঙ্গা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান বলেন, অভিযোগটি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হবে। সত্যতা মিললে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

উল্লেখ্য, এর আগেও নেত্রকোনায় রোহিঙ্গাদের ভুয়া কাগজপত্র তৈরির একাধিক ঘটনা ধরা পড়ে। গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর মোহনগঞ্জ উপজেলায় ইউএনওর আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে ১৩ রোহিঙ্গার জন্মনিবন্ধন তৈরির ঘটনায় এক কম্পিউটার দোকানদারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। একই বছরের ১৫ অক্টোবর বারহাট্টা উপজেলার আসমা ইউনিয়ন পরিষদে ভুয়া পরিচয়ে জন্মনিবন্ধন তৈরির আরেকটি ঘটনা স্থানীয়ভাবে আলোচনার জন্ম দেয়।