উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে যে নামটি সাধারণ শরণার্থী ও নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেটি হলো কেফায়েত উল্লাহ ওরফে হালিম। একদিকে হত্যা-ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ, অন্যদিকে মিয়ানমার সীমান্তকেন্দ্রিক মাদকের বিশাল সাম্রাজ্য ও অস্ত্রের চোরাচালান- সব মিলিয়ে ‘হালিম গ্রুপ’ এখন ক্যাম্পের অভ্যন্তরে এক মূর্তিমান আতঙ্ক।
আরসা থেকে এআরও: হালিমের উত্থান ও রূপান্তর
অনুসন্ধানে জানা যায়, কেফায়েত উল্লাহর অপরাধ জগতের হাতেখড়ি মিয়ানমারে। সেখানে তিনি নিষিদ্ধ সশস্ত্র সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা)-এর শীর্ষ পর্যায়ের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। সূত্র মতে, রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যাসহ একাধিক প্রভাবশালী নেতাকে সরিয়ে দেওয়ার নেপথ্যে তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল।
মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের পর কৌশলগত কারণে তিনি ‘হালিম’ নাম ধারণ করে আত্মগোপনে যান এবং কুতুপালং এলাকায় নিজস্ব বাহিনী গড়ে তোলেন। বর্তমানে তার এই ‘হালিম গ্রুপ’ আরসা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গঠিত আরাকান রোহিঙ্গা অরগানাইজেশন (এআরও) -এর প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। এআরও-এর প্রধান মাস্টার আইয়ুব নূর মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে মাদকের চালান পাঠান, আর ক্যাম্পের ভেতরে তা ডিস্ট্রিবিউশন ও নিরাপত্তার দায়িত্ব সামলান এই হালিম।
মাদক ও অর্থের শক্তিশালী সিন্ডিকেট
হালিম কেবল একজন সন্ত্রাসী নন, তিনি একটি বিশাল মাদক নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রক। ক্যাম্পের পরিচিত মাদক ডিলার এনায়েত উল্লাহ ও সিরাজ ওরফে চিকুন্নার মাধ্যমে ইয়াবার বড় বড় চালান বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেয় এই গ্রুপ।
এই অবৈধ অর্থই মূলত হালিম গ্রুপের অস্ত্র সংগ্রহ ও নতুন সদস্য নিয়োগের প্রধান উৎস। এই মাদক ব্যবসার লভ্যাংশ দিয়ে এনায়েত ও সিরাজ ইতোমধ্যে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে জমি কিনে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছেন।
খুন, ধর্ষণ ও অপহরণ
হালিম গ্রুপের বিরুদ্ধে নৃশংসতার অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে, যার মধ্যে কয়েকটি শিউরে ওঠার মতো-
গত বছরের ১০ জুন ক্যাম্প-৮-এর এক কিশোরীকে কক্সবাজারে নিয়ে গিয়ে হালিম ও তার অনুসারীরা পালাক্রমে ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঠিক তার পরের মাসে ৩ জুলাই রেশন আনতে যাওয়ার পথে আব্দুর রহমান নামের এক রোহিঙ্গাকে অপহরণ করে এই চক্র। পরে স্থানীয়দের হস্তক্ষেপে তিনি মুক্তি পেলেও তার ওপর চালানো হয় অমানসিক নির্যাতন।
এর ঠিক তিনদিন পর ৬ জুলাই তারিখে ক্যাম্প-১ (ইস্ট)-এ মাস্টার হামিদের নেতৃত্বে ১০-১২ জন সশস্ত্র সদস্য একটি দোকানে লুটপাট চালায়। এর প্রতিবাদ করায় দোকান মালিক ইউনুসকে দুই দিন আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়।
অস্ত্রের চোরাচালান
গত বছরের অক্টোবরে সংবাদমাধ্যম কালের কণ্ঠের ‘সাত রুটে অস্ত্র ঢুকছে দেশে’ শিরোনামের সংবাদটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ওই খবরে দাবি করা হয়- অনুসন্ধানে জানা গেছে, মায়ানমার সীমান্ত থেকে দেশে অস্ত্র পাচারে সক্রিয় রয়েছে পাঁচটি চক্র। এর মধ্যে আছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সশস্ত্র চারটি দল। এই দলগুলো হলো- আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা), রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও), রোহিঙ্গা সশস্ত্র সন্ত্রাসী হালিমের নেতৃত্বাধীন হালিম গ্রুপ ও নবী হোসেন গ্রুপ। এ ছাড়াও রয়েছে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানের অরণ্যে থাকা সন্ত্রাসীদের বড় চক্র। এই চক্রের সদস্য শতাধিক বলে জানা গেছে।
নতুন করে সক্রিয় হালিম গ্রুপের প্রধান কেফায়েত উল্লাহ ওরফে আব্দুল হালিম থাকেন উখিয়ার কুতুপালংয়ের ক্যাম্প-৭-এ। সেখানেই নৌকার মাঠ এলাকায় গড়ে তুলেছেন আস্তানা। কালের কণ্ঠের হাতে আসা ২০২৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারির একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মায়ানমারের রাখাইনের বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি এলাকার মায়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিপি) ঢেকিবনিয়া ঘাঁটি থেকে লুট করা অস্ত্রের ভিডিও করেছেন হালিম নিজেই। বিজিপির সেই ঘাঁটি থেকে অত্যাধুনিক বিপুল অস্ত্র কৌশলে মায়ানমার থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন হালিম।
আটক এবং ‘রহস্যজনক’ মুক্তি
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্যটি আসে গত ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে। ওই দিন বিকেলে উখিয়া ১৪ এপিবিএন অভিযান চালিয়ে ক্যাম্প-৭ থেকে হালিমসহ ৫ জনকে আটক করে। তবে আটকের কিছুক্ষণ পরেই নাটকীয় মোড় নেয় ঘটনা। আলামত না পাওয়ার অজুহাতে হালিমকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার উখিয়া সার্কেল রাকিবুল হাসান কেফায়েত উল্লাহ ওরফে হালিমকে গ্রেফতারের বিষয়টি অস্বীকার করে। তিনি বলেন, তাকে পুলিশও আটক করেনি, কেউ ধরে নিয়েও আসেনি এবং থানায়ও আনা হয়নি।
৮ এপিবিএন এর ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত ডিআইজি বলেন, হালিম আসলে ৮ এপিবিএন অধীনস্থ এলাকায় থাকে না- এ এলাকায় তার প্রভাব নেই। সে সম্ভবত ১৪ এপিবিএন এর অধীনস্থ এলাকায় থাকে।
এ বিষয়ে তিনি নিজের কঠোর অবস্থান তুলে ধরার সাথে সাথে ১৪ এপিবিএন-এ যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। এ বিষয়ে জানতে ১৪ এপিবিএন'র সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
উখিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও ৮ এপিবিএন-এর কর্মকর্তাদের বক্তব্যে এই আটক ও মুক্তি নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসনের এই সমন্বয়হীনতা বা রহস্যজনক নীরবতা অপরাধীদের মনে আরও আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে বলে মনে করছেন সাধারণ রোহিঙ্গারা।


