গ্যাসের সরবরাহ সংকট ও বাজারে অতিরিক্ত মূল্যের সুযোগে আবারও জ্বালানি কাঠ সংগ্রহে ঝুঁকছেন রোহিঙ্গারা। এতে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের সংরক্ষিত বনাঞ্চল দ্রুত উজাড় হয়ে পড়ছে এবং মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য।

জানা গেছে, উখিয়া-টেকনাফের ৩৩টি শরণার্থী শিবিরে বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ রোহিঙ্গার বসবাস। ২০১৭ সালের পর জ্বালানির চাহিদা মেটাতে ব্যাপক হারে বন উজাড় শুরু হয়। পরবর্তীতে বন রক্ষায় এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার সরবরাহ চালু করা হলেও সাম্প্রতিক তহবিল সংকটের কারণে সেই সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে ৪৫ দিনের জন্য দেওয়া ১২ কেজির একটি গ্যাস সিলিন্ডার গড়ে ১৫ থেকে ২০ দিনের বেশি টিকছে না। ফলে বাকি সময়টায় অন্তত ২০ দিন রোহিঙ্গাদের জ্বালানি কাঠের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। স্থানীয় বাজারে একটি সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ২০০ টাকার বেশি হওয়ায় তা কেনাও তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।

খাদ্যসহায়তা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। আগে মাসিক ১২ ডলার করে সহায়তা পেলেও বর্তমানে তা কমে ৭ থেকে ১২ ডলারে নেমে এসেছে। এতে নিত্যপ্রয়োজন মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছে রোহিঙ্গা পরিবারগুলো।

বালুখালী ক্যাম্পের বাসিন্দা আবুল আলী জানান, একটি পরিবারের দৈনিক গড়ে প্রায় ৫ কেজি জ্বালানি কাঠ প্রয়োজন হয়। সে হিসেবে ২০ দিনের জন্য লাগে প্রায় ১০০ কেজি কাঠ। ২ লাখ ৪৫ হাজার পরিবারের জন্য মাসিক প্রয়োজন দাঁড়ায় প্রায় ২ কোটি ৪৫ লাখ কেজি কাঠ, যার প্রায় পুরোটাই সংগ্রহ করা হচ্ছে সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে।

কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে আবারও বনাঞ্চলে চাপ বেড়েছে। ২০১৭ সালের আগে উখিয়া-টেকনাফে প্রায় ১০ হাজার একর বনায়ন থাকলেও রোহিঙ্গা আগমনের পর তা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে নতুন করে ৭ হাজার একরে বনায়ন করা হলেও বর্তমানে সেগুলোও হুমকির মুখে।

শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, তহবিল সংকটের কারণে মাসিক গ্যাস সরবরাহ এখন ৪৫ দিনের জন্য বণ্টন করতে হচ্ছে। এতে ১০ থেকে ১৫ দিনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা পূরণে রোহিঙ্গারা বন থেকে কাঠ সংগ্রহ করছে।

২০১৮ সালে ‘সেফ প্লাস’ কর্মসূচির আওতায় ২ লাখ ৪৫ হাজার পরিবারে এলপিজি বিতরণ শুরু হয়, যা বর্তমানে ‘সেফ প্লাস-টু’ নামে পরিচালিত হচ্ছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) যৌথভাবে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, এলপিজি ব্যবহারের ফলে গত কয়েক বছরে বন উজাড় ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমেছিল।

তবে বন বিভাগের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী জুনের মধ্যেই উখিয়া-টেকনাফের সংরক্ষিত বনাঞ্চল মারাত্মকভাবে উজাড় হয়ে পড়তে পারে। ২০১৭-১৮ সালে ক্যাম্প নির্মাণে ইতোমধ্যে ২ হাজার ২৭ একর সৃজিত বন এবং ৪ হাজার ১৩৬ একর প্রাকৃতিক বন ধ্বংস হয়েছে। এতে পাহাড় ধসের ঝুঁকি বেড়েছে এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হয়েছে।

বিশেষ করে হাতির বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে পড়ায় খাদ্য সংকটে পড়েছে এশীয় প্রজাতির ৬৭টি হাতি। গত আট বছরে হাতির আক্রমণে ১১ রোহিঙ্গাসহ ১৩ জনের মৃত্যু এবং শতাধিক ব্যক্তি আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।