নোয়াখালীর ভাসানচরে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের একটি বড় অংশ দিন দিন সেখান থেকে পালিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। নিরাপত্তা সংস্থার একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, জনপ্রতি তিন থেকে চার হাজার টাকা নিয়ে দালালচক্র তাদের কাঠের নৌকায় চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর উপকূলে পৌঁছে দিচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এই পলায়ন শুধু আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্যই নয়, দেশের সার্বিক নিরাপত্তার জন্যও গুরুতর হুমকি হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মিয়ানমারের হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতনের মুখে কক্সবাজারে আশ্রয় পাওয়া রোহিঙ্গাদের একটি অংশকে উন্নত জীবনযাপনের কথা বলে ভাসানচরে স্থানান্তর করেছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থান, চিকিৎসা, চলাচল ও শিক্ষাসহ নানা সুযোগ-সুবিধা সংকুচিত হওয়ায় সেখানকার জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে রোহিঙ্গাদের পলায়নের প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ভাসানচরে স্থানান্তর করা হয় ৩৬ হাজার ৮৯৮ রোহিঙ্গাকে। সেখানে জন্ম নেওয়া তিন হাজার শিশুকে নিয়ে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৪০ হাজারে। কিন্তু পালিয়ে যাওয়ার কারণে বর্তমানে ভাসানচরে রয়ে গেছে মাত্র ২৯ হাজার ৮৪২ জন। শুধু নভেম্বর মাসেই ৩৮৯ জন রোহিঙ্গা পালিয়ে গেছে, যা মৌসুমের সর্বোচ্চ।
পলায়নের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে– আয় নেই, কাজের সুযোগ সীমিত, চিকিৎসা সেবা সংকুচিত, শিক্ষার সুযোগ কমে যাওয়া, বাইরে অবাধ চলাচলের নিষেধাজ্ঞা এবং কক্সবাজারে সহজে এফসিএন কার্ড নবায়নের সুবিধা। আরও আছে রোহিঙ্গা পুরুষদের একাধিক স্ত্রীর ভিন্ন ভিন্ন স্থানে থাকা, যা পরিবারভিত্তিক পলায়নকে ত্বরান্বিত করছে।
গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, ভাসানচরের সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়েই সক্রিয় হয়েছে দালালচক্র। রাতের অন্ধকারে ক্যাম্প থেকে বের হয়ে রোহিঙ্গারা দক্ষিণ-পূর্বের প্যারাবন এলাকায় জড়ো হয়। জোয়ার-ভাটার সুবিধা বুঝে তারা কাদামাটি পেরিয়ে নৌকায় ওঠে। কেউ কেউ হেঁটে জাইজ্জারচর বা স্বর্ণদ্বীপে পৌঁছে সেখান থেকে নৌকাযোগে নোয়াখালীতে আসে। এরপর চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থান কিংবা উখিয়া–টেকনাফের ক্যাম্পে পুনরায় আশ্রয় নেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাসানচরে ঠেকিয়ে রাখা এবং অভ্যন্তরীণ স্থানান্তরের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) মো. এমদাদুল ইসলাম বলেন, ভাসানচরে কর্মসংস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার ঘাটতি থাকায় রোহিঙ্গারা পালিয়ে যাবে- এটাই স্বাভাবিক। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন ছাড়া বাংলাদেশের সামনে দ্বিতীয় কোনো পথ নেই।
বর্তমান পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা পলায়ন রোধে পাঁচটি সুপারিশ করেছে নিরাপত্তা সংস্থা। এর মধ্যে আছে- ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জীবিকা কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করা, স্বাস্থ্যখাতে সরকারি চিকিৎসক নিয়োগ ও জরুরি ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা, শিশুদের জন্য শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ, নতুন করে স্বল্পমাত্রায় রিলোকেশন প্রক্রিয়া চালু রাখা এবং কোস্টগার্ড–এপিবিএনের লজিস্টিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো। পাশাপাশি পলায়নের সম্ভাব্য স্থানগুলোতে নিয়মিত টহল জোরদার করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘের হিসাবে বাংলাদেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ, যদিও সরকারের ধারণা প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা- পলায়নের এই ধারা অব্যাহত থাকলে রোহিঙ্গা সংকট দ্রুতই জাতীয় নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনীতির ওপর ভয়াবহ চাপ তৈরি করবে। একই সঙ্গে তারা মনে করেন, মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনাকে নতুনভাবে সক্রিয় করতে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার চীনের উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক সম্পর্ককে কাজে লাগাতে পারে।
সূত্র- কালবেলা অনলাইন


