সাগরের কূল ঘেঁষে পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে বয়ে চলা অগণিত ঝরনার জলধারায় প্রকৃতির অপরূপ সৃষ্টি কক্সবাজার। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের এই জনপদটি, পর্যটনশিল্প, লবণ, মাছ, গাছ এবং সামুদ্রিক সম্পদে ভরপুর। কিন্তু দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সীমান্ত জেলা কক্সবাজার এখন মাদক ও মানব পাচার, স্বর্ণ ও অস্ত্র চোরাচালানের রুট হিসেবে পরিচিত পেয়েছে। এই জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পাশাপাশি বেড়েছে পাহাড়ধস, পরিবেশদূষণ ও সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে লবণাক্ততা সমস্যা। তবে সব সমস্যাকে ছাড়িয়ে ২৬ লাখ লোকের এই জেলার জন্য রোহিঙ্গারা হয়ে উঠেছে বিষফোড়া। শত সমস্যার বেড়াজালে বন্দি সম্ভাবনার কক্সবাজারের সবচেয়ে জটিল ও মারাত্মক সমস্যায় রূপ নিয়েছে রোহিঙ্গা সংকট।
এ জেলার দুটি উপজেলা উখিয়া ও টেকনাফে ১২ লাখ নিবন্ধিত রোহিঙ্গা বসবাসের তথ্য থাকলেও মূলত জেলা জুড়ে প্রায় ২০ লাখের মতো রোহিঙ্গা রয়েছে। এসব রোহিঙ্গা নির্ধারিত ক্যাম্প থেকে বের হয়ে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এদের মধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা নানা কৌশলে এ দেশের জাতীয় পরিচয়পত্র হাতিয়ে নিয়েছে। আর এই জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে পাসপোর্ট তৈরির মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গিয়ে অপকর্ম করছে এবং ধরা খাওয়ার পর আমাদের দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে আন্তর্জাতিকভাবে।
এ বিষয়ে কক্সবাজার রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মাহাবুবুর রহমান বলেন, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলেও এর ফলে কক্সবাজারে বহুমাত্রিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। প্রথমত, পরিবেশগত সমস্যা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাসের জন্য পাহাড় কাটা ও বন উজাড় করা হয়েছে। এতে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে এবং ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়েছে। জ্বালানির জন্য গাছ কাটার ফলে বনাঞ্চল দ্রুত কমছে। পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে পরিবেশদূষণও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ বেড়েছে। স্থানীয় জনগণের সঙ্গে শরণার্থীদের কর্মসংস্থান নিয়ে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। কম মজুরিতে কাজ করতে রাজি হওয়ায় স্থানীয় শ্রমিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাজারদর বৃদ্ধি, জমির মূল্যবৃদ্ধি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষ কষ্টে পড়েছে। সামাজিকভাবে নিরাপত্তা ও অপরাধের ঝুঁকিও বেড়েছে বলে অনেকে মনে করেন।
তৃতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মাদক পাচার, চোরাচালান ও সংঘবদ্ধ অপরাধের সঙ্গে শরণার্থীশিবিরের নাম জড়িয়ে রয়েছে। যদিও সব রোহিঙ্গা এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত নয়, তবু সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি প্রশাসনের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চতুর্থত, অবকাঠামোগত চাপ বেড়েছে সড়ক, স্বাস্থ্যসেবা, পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থায়। আন্তর্জাতিক সহায়তা থাকলেও দীর্ঘ মেয়াদে এত বড় জনগোষ্ঠীর দায়িত্ব বহন করা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য কঠিন। তাই আমরা চাই রোহিঙ্গাদের দ্রুত এ দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া হোক। আর এর জন্য কক্সবাজারের সংসদ সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখুক।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) কক্সবাজার জেলা সভাপতি অজিত দাশ বলেন, ‘আমাদের জেলার যত অপরাধ হয় তার ৯০ শতাংশের সঙ্গে রোহিঙ্গারা জড়িত। ইয়াবা, অস্ত্র, স্বর্ণ চোরাচালান, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই কিংবা অপহরণ সবকিছুতেই তারা জড়িত। তাই তাদের দ্রুত এ দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া দরকার।
তিনি আরও বলেন, এটাও সত্য, রোহিঙ্গারা নিজেরাও মানবিক সংকটের শিকার। তারা নিজ দেশ থেকে নির্যাতিত হয়ে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে এসেছে। তাই এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান শুধু মানবিক সহায়তার মাধ্যমে নয়, বরং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও মিয়ানমারে নিরাপদ এবং সম্মানজনক প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমেই সম্ভব। আর আমি বিশ্বাস করি, নতুন সরকার রোহিঙ্গা সংকটকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে এর একটি স্থায়ী সমাধান করবেন। বর্তমানে আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পেয়েছি সালাহউদ্দিন আহমদকে। যিনি এই কক্সবাজারের সন্তান। আশা করব এবার একটা স্থায়ী সমাধান হবে।
নিরাপত্তাবিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদ হোসেন বলেন, শুধু কক্সবাজার নয়, রোহিঙ্গারা এ দেশের জন্য হুমকি। এজন্যই কক্সবাজারের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান অত্যন্ত জরুরি। এ সংকটের সমাধান হলে এই জেলার সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাবে। এর জন্য সরকারকে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করতে হবে। স্থানীয় সংসদ সদস্যদের রোহিঙ্গা সংকটকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত সমাধান করতে হবে।
সূত্র- দেশ রূপান্তর


